———-

আঞ্চলিক বৈষম্যের যাতাকলে

উত্তরাঞ্চলের সম্ভাবনা

যাহেদুর রহমান    

 

গত সরকারের আমলে সিলেট থেকে অর্থমন্ত্রী, এবারও সিলেট এলাকা থেকে অর্থমন্ত্রী নির্বাচিত করা হয়েছে। তাই তাদের বাজেট তৈরির সময় অবহেলিত উত্তর জনপদের দিকে নজর থাকে না। মংঙ্গা পীড়িত অঞ্চল বলে পার্লামেন্টে সমবেদনা জানানো হয় মাত্র

 

বগুড়া বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য শহর ও বাণিজ্যকেন্দ্র। বগুড়া দেশের উত্তরাঞ্চলের ১৬ টি জেলার প্রাণকেন্দ্র, কৃষি ও শিল্প নগরী হিসেবে পরিচিত। ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য, সস্কৃতিতে বগুড়া অন্যান্য জেলার চেয়ে রয়েছে এগিয়ে। পুন্ড্র নগরের রাজধানী মহাস্থানগড় বগুড়াকে সারা দেশ ও বিশ্বের কাছেও আলাদা ভাবে পরিচিত করেছে। বগুড়া জেলার অধিকাংশ এলাকাই চাষের অধীন। মোট কৃষি জমির প্রায় দশ শতাংশ এলাকা তিন ফসলী, ৩৮ শতাংশ এলাকা দুই ফসলী এবং ৪০ শতক এলাকা এক ফসলী। মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসনে থাকা প্রাচীন পুন্ড্রের কেন্দ্রবিন্দুই হচ্ছে আজকের বগুড়া। শিল্প ক্ষেত্রেও বগুড়ার স্থান আলাদা। কৃষি মেশিনারীর ৯০ ভাগ যন্ত্রাংশ তৈরী হয় বগুড়ায়।

বাংলাদেশের মানচিত্রকে যদি দারিদ্রের মাপকাঠিতে সাজানো হয়, তাহলে দেখা যাবে দেশের মধ্যে দুটি রূপ। দেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে হতদরিদ্র ও গরিব মানুষের সংখ্যা বেশি। বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের জনপদে বাড়ছে বেকারত্ব। ২৭ লাখ নতুন বেকার যোগ হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম এসব অঞ্চল এখন কৃষি থেকে ঝুঁকে পড়েছে শিল্পের দিকে। কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় উৎস কৃষি খাত। কিন্তু গত তিন বছরে এই খাতে কাজের সুযোগ তো বাড়েইনি বরং কমেছে। এর অর্থ হল গত তিন বছরে যে ২৭ লাখ মানুষ বেকারত্বের খাতায় নাম লিখিয়েছে তাদের ২১ লাখই বাস করে গ্রামে। আর শহরে মাত্র ৬ লাখ। মৌসুমী বেকারত্বের বেলায়ও অবস্থা একই। দেশে এখন অকৃষি খাতে কাজের পরিমান বাড়ছে। শুধু শিল্প খাতেই তিন বছরে ১৬ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কাজের সুযোগ বেড়েছে নির্মান শিল্পেও। নির্মান শিল্পের দ্রুত প্রসার লাভ করেছে ঢাকা, চিটাগাং, নারায়নগঞ্জ প্রভৃতি এলাকায়। উত্তরাঞ্চলে আবাসন খাতে ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ দেয়া হয় না। উত্তরাঞ্চলে বহুতল বিশিষ্ট বাড়ি তৈরি করতে গেলে নানা বাধা বিপত্তির মধ্যে পড়তে হয়। অথচ ঢাকা অঞ্চলে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও উত্তরায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে বহুতল অফিস ও স্থাপনা। অন্যদিকে পূর্ব মধ্যাঞ্চলে জেলাগুলোতে রয়েছে দারিদ্রের ছোঁয়া। ২০০০-২০১০ এই দশ বছরে দেশে যেখানে গড়ে ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ হারে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছে সেখানে বগুড়া ও উত্তর জনপদে এই হারের গড় মাত্র ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। তাই এখন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর মাধ্যমে আরও বেশি কর্মসংস্থান উত্তরাঞ্চলে তৈরি করতে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সাথে বিনিয়োগ বাড়িয়ে বেসরকারি খাতে এই অঞ্চলে কাজের সুযোগ তৈরির পুরনো তত্ত্ব মনে করিয়ে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও বিদ্যুৎ ও গ্যাস এবং ব্যাংক ঋণের সমস্যার কারনে এই অঞ্চল একরকম স্থবির হয়ে পড়েছে। খাদ্য শস্যর ভান্ডার হিসেবে পরিচিত উত্তরাঞ্চল গত পাঁচ বছর ধরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রতি বছর গড়ে শতকরা ৫ ভাগের বেশি হারে চাল উৎপাদন করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কৃষি বিজ্ঞানী এবং বিশেষজ্ঞদের মতে এই অঞ্চলের কৃষকরা তাদের চাষযোগ্য সীমিত জমিতে অত্যাধুনিক কৃষি প্রযুক্তির পাশাপাশি উচ্চফলনশীল নানান জাতের বীজ ব্যবহার করায় হেক্টর প্রতি ধান উৎপাদন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এই ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে অব্যহত থাকবে। সর্বাধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং সারসহ বিভিন্ন উপকরনের যথাযথ ও সঠিক ব্যবহারের পাশাপাশি চাষাবাদের সুব্যবস্থাদির নিশ্চিতকরন এবং উৎপাদিত ধানের সঠিক মূল্য কৃষকদের দিতে পারলে চালের উৎপাদন আরো অধিক হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সূত্রে জানা যায়, ৩১ ডিসেম্বর ২০১২ পর্যন্ত তিন বছরে মোট উৎপাদিত হয়েছে ৩ কোটি ৬৭ লাখ ৭৫ হাজার ৩৮১ টন, বোরো, রোপা আমন, আউশ ও বুনো আমন চাল। ২০০৮-২০০৯ মৌসুমে কৃষকদের মোট উৎপাদিত চালের পরিমাণ হচ্ছে ১ কোটি ১৬ লাখ ২২ হাজার ২৪ টন। ২০০৯-২০১০ মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের মোট উৎপাদিত চালের পরিমান ছিল ১ কোটি ২২ লাখ ১৯ হাজার ৬৭ টন। বর্তমান সরকার কতৃক সুদুরপ্রসারী নানা ধরনের কৃষক ও কৃষিবান্ধব গতিশীল ও বাস্তবমুখি পদক্ষেপ গ্রহণ করায় চালের উৎপাদন এই অঞ্চলে উত্তরাত্তর বৃদ্ধি হতে থাকবে। বন্যা ও খরা সহিষ্ণু জাতের ধানের আবাদ বাড়তে থাকায় চালের উৎপাদন বৃদ্ধিতেও তার প্রভাব পড়েছে। পূজিবাদের অর্ন্তনিহিত অসম উন্নয়নের নিয়মে কোনো একটি অঞ্চলের উন্নয়ন অন্য অঞ্চলের অনুন্নতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অর্থনীতির পরিভাষায় একে বলা হয় “আঞ্চলিক বৈষম্য”। বাজার ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা, বানিজ্যে, সহায়ক শিল্প ও অধিকতর মুনাফা লাভের নিশ্চয়তা আছে পুঁজি ও শ্রম শক্তি সেদিকেই ধাবিত হয়। দেশ স্বাধীন হবার আগে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল এর দৃষ্টান্ত। এমন মত রূশ অর্থনীতিবীদ এস.এম বারানভানবের। তিনি ১৯৬৪ সালে ঢাকায় এসে ৬ মাস তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের অনেক জেলা ঘুরেছিলেন। তার তীক্ষè পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা থেকে পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বিকাশ ও বৈষম্যমের মূল্যবান চিত্র বেড়িয়ে এসেছিল। কালক্রমে সেই চিত্র আজ বাংলাদেশের আঞ্চলিক বৈষ্যম্যের সাথে খাপ খায়।

 

বিশেষ করে পূর্ব মধ্যাঞ্চলের সাথে ঢাকা, চিটাগাং উন্নয়নের অসংগতি অনেকটাই এর প্রতিরূপ। দারিদ্রের আঞ্চলিক বিবেচনায় স্পষ্টতই বাংলাদেশ দুটি অংশে ভাগ হয়ে পড়েছে। দেশের ভৌগলিক মানচিত্রে আমরা দেখতে পাই এই আঞ্চলিক বৈষম্য অসহনীয় ও দুর্ভাগ্যজনক। বৈষম্যের পদক্ষেপেই স্পষ্ট করেছে বিগত সরকারগুলোর অনেক পদক্ষেপই ভারসাম্যপূর্ন ছিল না এবং এটা স্পষ্ট হয়েছে যে পূর্বাঞ্চলে রয়েছে অনেক সুবিধাজনক অবস্থান। আর  তা ঘটেছে অপরাপর অঞ্চলকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে। একদিকে সরকারের আনুকুলল্যের ঢল, অপরদিকে লাগাতার উপেক্ষা – এ এক দুঃখ জনক বাস্তবতা। ২০০৩-২০০৪ সাল থেকে ক্রমাগত সিলেট অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় তহবিল ও উন্নয়ন প্রকল্প চলে যাওয়া তারই প্রমাণ। গত সরকারের আমলে সিলেট থেকে অর্থমন্ত্রী, এবারও সিলেট এলাকা থেকে অর্থমন্ত্রী নির্বাচিত করা হয়েছে। তাই তাদের বাজেট তৈরির সময় অবহেলিত উত্তর জনপদের দিকে নজর থাকে না। মংঙ্গা পীড়িত অঞ্চল বলে পার্লামেন্টে সমবেদনা জানানো হয় মাত্র। স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স ৪১ বছর। অর্থাৎ বাংলাদেশ ৪ দশক অতিক্রম করেছে। ঐতিহ্য ও সম্পদে সমৃদ্ধ অপার সম্ভবনাময় একটি দেশ বাংলাদেশ। মংঙ্গা পীড়িত অঞ্চল বলে দেশের একটি অংশকে অবহেলা করলে বা অন্য দৃষ্টিতে দেখলে দেশ খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলবে। দেশ থেকে দূর্নীতি মূলোৎপাটন করে সব অঞ্চলকে ন্যায় ভিত্তিক সমাজ ও উন্নয়নের শাসন প্রতিষ্ঠা হলে বাংলাদেশ হবে এশিয়ার একটি শ্রেষ্ঠ দেশ। উত্তরজনপদের পবিত্র ভূমিতে গড়ে উঠেছে তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য। ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম থেকে শুরু করে উত্তরাঞ্চলবাসীর আমাদের গর্বের ভাষা এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ দেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার বিহার ইউনিয়নের বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীকে কে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্বরণ করি। পূর্বজনদের এমন গৌরবময় ধারাবাহিকতায় বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলবাসী হিসেবে আমরা গর্বিত। ঈর্ষণীয় ভৌগলিক অবস্থান বগুড়াকে উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্রে রুপান্তিত করেছে। উত্তরজনপদ থেকে চামড়া, মাছ, পাট, শাক-সবজীর, পাটজাত পণ্যে রপ্তানী থেকে আয় বৃদ্ধির আমাদের বিশেষভাবে আশান্নিত করে। ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্পের কদরও বিদেশের বাজারে রয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর উত্তরাঞ্চলে কৃষি ঋণ সংগ্রহের জন্য নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। ১০ টাকায় ব্যাংক একাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কৃষি ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেয়া হয়েছে এবং উপকরণ সৌজন্য করা হয়েছে। বর্তমান সরকার সার প্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে। উত্তরাঞ্চলে কৃষি ক্ষেত্রে এ ধারা অব্যহত থাকলে এক সময় সরকার তা বাস্তবায়ন করতে সফল হবে। মনে রাখতে হবে কৃষি আবিস্কার করা মানে দেশে সামগ্রিক এবং ইতিবাচক প্রভাব পড়া। উত্তরাঞ্চলে শিল্পায়নের দিকে সরকারের নজর দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতির জন্য। সার শিল্প প্রসার না করলেও ক্ষুদ্র শিল্প বেশ প্রসারলাভ করেছে। বগুড়ার হালকা প্রকৌশল শিল্পে সম্ভবনা বিবেচনা করে বগুড়ায় হালকা প্রকৌশল শিল্প জোন গঠন করার বিষয়টি সরকারি উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে। উত্তরবঙ্গের শিল্পদা খ্যাত বগুড়ার ইতিহাস অতি প্রাচীন। স্বাধীনতাউত্তর কালে জামিল গ্রুপ অব ইন্ডাসট্রিজ বিখ্যাত জান- ই- সাবা সাবান, ভার্জিনিয়া টোবাকো কোম্পানি, ভান্ডারী আয়রন ওয়াকর্স, তাজমা সিরামিক ইন্ডাসট্রিজের তৈজসপত্র দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হতো।

কালের আবর্তে সেই সব শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু বগুড়ায় বর্তমানে শিল্প অঙ্গন নতুন ভাবে আশার আলো সঞ্চার করছে। যে ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্প বগুড়া তথা দেশের অর্থনীতির চাকাকে করেছে বেগবান। সেটি হলো বগুড়ার লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং বা হালকা প্রকৌশল শিল্প। প্রায় ৮০টি কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদন কারখানা, ১০০টি কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদন কারখানা ও ওয়ার্কসপ, ২৫০টি কৃষি যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ বিপননের কেন্দ্রে ছেয়ে গেছে বগুড়া শহরের পাশবর্তী এলাকা সমূহ। বগুড়া ও উত্তরাঞ্চলে মাথাপিছু আয় সহ নানা ক্ষেত্রে অর্থনীতির সূচকের যে অগ্রগতি হয়েছে তাতে এটাই প্রতিয়মান হয় যে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি ঘুরিয়ে দাড়িয়েছে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। বগুড়া তথা উত্তরঞ্চলকে আরো এগিয়ে যেতে হলে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুষ্ঠ কর্মপরিকল্পনা ও কর্মছক তৈরী করতে হবে। প্রধান্য দিতে হবে জন্মস্বার্থকে। বগুড়ার উন্নয়নে যা করতে হবে এখনি তা হলো- বগুড়াকে সিটি কর্পোরেশন ঘোষনা, বগুড়া শহরের এককালের প্রবর্তন  করতোয়া দখল মুক্ত করে একে পুনঃখননের উদ্যগ গ্রহণ, একটি বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও বিশ্যবিদ্যালয় স্থাপন, শহরের মধ্যে ছেলেদের জন্য একটি ও মেয়েদের জন্য একটি সরকারি স্কুল স্থাপন, বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত রেল পথ স্থাপন, বগুড়ায় আধুনিক ফুটবল স্টেডিয়াম স্থাপন, বগুড়া প্রেস ক্লাব নতুন ভবন স্থাপন, মহাস্থান গড়কে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা, যমুনা নদীকে ড্রেজিং করে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র বগুড়াকে কেন্দ্র করে একটি নতুন বিভাগ স্থাপন ও সারিয়াকান্দিতে ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপন। সরকারি মঞ্জুরী বা বরাদ্দ সংক্রান্ত ব্যবধান দূর করতে হবে অবহেলিত উত্তরাঞ্চলে। পশ্চিমাঞ্চলে বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, জয়পুরহাট, লালমনিরহাট, ও পাবনায় বসবাসকারী জনসংখ্যা যেখানে ৫০ শতাংশের মত সেখানে পূর্বাঞ্চলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশালে জনসংখ্যা ২৭ শতাংশ। এটা আমাদের দূর্ভাগ্য যে সরকারের মঞ্জুরী বা বরাদ্দের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক প্রয়োজনীয়তার চেয়ে ব্যক্তিগত প্রভাব, রাজনৈতিক ফায়দা কাজ করে বেশি। স্বাধীনতার ৪২ বছর চলছে  অথচ এ দীর্ঘ সময়েও উত্তরজনপদের মানুষের ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সুষ্ঠু যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানীর অভাবে বগুড়া তথা উত্তরাঞ্চল সামাজিক, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা থেকে বঞ্চিত। উত্তরাঞ্চলের কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের সুষ্ঠু ভাবে বাজারজাত করনের অভাবে ন্যয্য মূল্য পায় না। এ অঞ্চলের মানুষের বিরাট আশা ছিল যমুনা ব্রিজ স্থাপন হলে এ অঞ্চলের জনগনের ভাগ্যেও পরিবর্তন হবে। যমুনা সেতুর টোল অনেক বেশি হওয়ায় সাধারন কৃষকের পরিবহন ব্যয়সহ অন্যান্য ব্যয় মিটিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারে না।

ফলে এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনীতির দিক থেকে যেভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল সেভাবে এগিয়ে যেতে পারছে না। ভারসাম্য আঞ্চলিক উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ন ভিন্ন। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৫৯২৮ মেগাওয়াট হলেও উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বিগত ৫ বছরে যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে তার মোট ক্ষমতা মাত্র ৫৩১ মেগাওয়াট যা দেশের মোট ক্ষমতার ১১ শতাংশ। ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ৯৪২৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তার মধ্যে উত্তরবঙ্গে মাত্র ১৫৭৫ মেগাওয়াট রয়েছে। আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়ছে দেশের ব্যংকিং সেবার ক্ষেত্রে। ব্যাংকিং খাতের মোট বিনিয়োগের প্রায় ৬৮ শতাংশ হচ্ছে ঢাকা বিভাগীয় শহরে। বরিশাল বিভাগে মাত্র ১ শতাংশ। এর পর রয়েছে সিলেট, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের অবস্থান। বগুড়ায় বিনিয়োগ হয় মাত্র ৫ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয় বেশি ঢাকা বিভাগে ও চট্টগ্রাম বিভাগে। বগুড়ার মত প্রাচীন জেলায় এখনও কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত  নেওয়া হয় নি। আশা করি সরকার এমন পদক্ষেপ নেবেন যেনো দেশের সব অঞ্চল তার প্রয়োজন ও প্রাপ্য অনুযায়ী উন্নয়ন বরাদ্দ লাভ করে এবং সে অনুযায়ী উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করে। তাতে দেশ সুষমভাবে উন্নয়নের সঠিক পথে এগিয়ে যাবে। আঞ্চলিক বৈষম্যর এ প্রবণতা পরিহার করে জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাজেটে হিস্যা দিলে এ আঞ্চলিক বৈষম্য ধীরে ধীরে কমে যাবে বলে মনে করা হয়। আমরা স্বপ্ন দেখি, অদূর ভবিষ্যতে বগুড়া সহ উত্তরাঞ্চল হবে মানবতার গৌরব দীপ্তিতে উজ্জীবিত দেশের কৃষি, কৃষি শিল্প, শিক্ষা- সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র। উত্তরাঞ্চলবাসী এক আকাশের তলে একটি পরিবার হিসেবে বসবাস করবে। বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাড়িয়ে সূর্যকরোজ্জ্বল রবীন্দ্র বচনে বলতে পারবো,

“অন্ন চাই, বস্ত্র চাই,

আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু।

চাই বল, চাই স্বাস্থ্য,

আনন্দ-উজ্জ্বল, পরমায়ু”।

আমাদের এই মহৎ আকাঙ্খার সফল কর্ম প্রয়াসে আপনাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে আমরা আপন করে পেতে চাই।

 

লেখক পরিচিতিঃ যাহেদুর রহমান যাদু

সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

সহকারী সম্পাদক- দৈনিক করতোয়া

জেলা সংবাদ প্রতিনিধি- বাংলাদেশ টেলিভিশন।