আমার সাংবাদিকতা-

পিছনে ফিরে দেখা কয়েকটি স্মৃতি

আমান উল্লাহ খান

সাংবাদিকতা পেশার সাথে প্রায় ৫২ বছর জড়িত আছি। পেশাজীবী হিসাবে দায়িত্ব পালন কালে নানা বিচিত্র ঘটনা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছে। দৈনিক ইত্তেফাকের ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি এবং ছাত্রলীগ নেতা হিসাবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ পেয়েছি। তাঁর উত্তরবঙ্গ সফরকালে সাংবাদিক হিসাবে এবং দলীয় কর্মী হিসাবে তাঁর সঙ্গে ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে। তাঁর সঙ্গে একই জনসভায় বক্তৃতা দেবারও সৌভাগ্য হয়েছে। সমম্ভবত ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাস।  বঙ্গবন্ধু উত্তরবঙ্গ সফরে এলেন।  আমি দায়িত্বপালনের জন্য শাহজাদপুরে তার সঙ্গে মিলিত হই। শাহজাদপুরের তদানিন্তন এম,এল,এ হোসেন মনসুরের আমন্ত্রণে শাহজাদপুরের একটি রেষ্ট হাউজে বঙ্গবন্ধু তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে মধ্যাহ্নভোজে মিলিত হন। খাবার টেবিলে তিনি আমাকে বলেন, ‘আমান উল্লাহ তুইতো শুধু আমার জনসভার ছবি ইত্তেফাকে ছাপিস। আমার খাবার টেবিলের ছবিতো তুলিস না। আমি বললাম, “ঠিক আছে আপনি পোজ দিন আমি ছবি তুলছি”। ছবি তোলার আগে তিনি বললেন, “ক্যামেরায় ক্লিক করার আগে আমাকে তুই রেডি ওয়ান টু থ্রী বলবি। এবং থ্রী বলার পর ছবি তুলবি।”

আমি যথারীতি ওয়ান টু থ্রী বলে ক্যামেরায় শাটার টেপার মুহুর্তে তিনি হঠাৎ তাঁর মাথা টেবিলের নীচে লুকালেন। শার্টার টেপার পর তিনি বললেন, “আমান উল্লাহ আমার ছবি উঠেছে?” আমি বললাম বঙ্গবন্ধু আপনি মাথা লুকালে ছবি উঠবে কিভাবে? তিনি বললেন-“তাহলে তুই কিসের সাংবাদিক?” সাংবাদিকদের সাথে তিনি এভাবেই রসিকতা করতেন ।

২.

সম্ভবত ১৯৫৭ সালে আমি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে অধ্যায়নরত। কখনও কখনও দৈনিক ইত্তেফাকে সংবাদ প্রেরণ করতাম।  শাহজাদপুরের একটি জনসভায় ভাষণ দিতে উঠে দলীয় নেতৃবৃন্দসহ ট্রেনযোগে লাহিড়ী মোহনপুরে এসে সেখান থেকে নৌকাযোগে শাহজাদপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন মাওঃ ভাসানী। সংগতকারণেই (আদব লেহাজের ঘাটতি হতে পারে এই ভয়ে) সফরসঙ্গীদের কেউ তাঁর নৌকায় উঠলো না। আমি সাংবাদিক হিসাবে তার নৌকায় উঠলাম। একজন স্থানীয় দলীয় নেতা তার নৌকায় ৫ হাঁড়ি মিষ্টি দিলেন। মাওঃ ভাসানী আমাকে নির্দেশ দিলেন এক হাঁড়ি মিষ্টি মুকুদের নৌকায় দাও। মুকু মানে স্থানীয় একজন নেতা যার সাথে অপর একটি নৌকায় মওলানা হুজুরের সফর সঙ্গী নেতারা ছিলেন। তাঁর নির্দেশ মত এক হাড়ি মিষ্টি ঐ নৌকায় দেওয়ার পর বাকী ৪ হাঁড়ি মিষ্টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, এগুলোর কি হবে? তিনি বললেন তুমি আর আমি যেতে যেতে খাবো।  যাত্রাপথে ঐ ৪ হাঁড়ি মিষ্টির প্রায় সমুদয় তিনি গল্পের ফাঁকে ফাঁকে খেলেন। তাঁর অনুরোধে দু’চারটা মিষ্টি আমিও খেলাম। (বাপ রে বাপ হুজুরের মিষ্টি খাওয়া দেখে শেরে বাংলার বিপুল পরিমাণে খাওয়া-দাওয়ার কথা মনে হলো)। বিকালের দিকে আমরা শাহজাদপুরের জনসভাস্থলে পৌঁছালাম।” তার কাছে দলীয় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নেতা হিসাবে আমি বক্তৃতা করার সুযোগ চাইলাম। আমার অনুরোধ রেখে তিনি মঞ্চে বললেন, “আমান উল্লাহ তুমি বক্ততা দাও। আমার বক্তৃতার পর তিনি নিজে বক্তৃতা শুরু করলেন। মাগরিব পর্যন্ত একটানা বক্তব্য রাখলেন।

মাগরিবের ওয়াক্তে মিটিং শেষ হলো। ঐ মিটিং এ তিনি একাই বক্তব্য কেন রাখলেন কোন নেতাই তা বলার সাহস পেলেন না। আমিও ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলাম না কেন হুজুর একাই বক্তব্য রাখলেন। উল্লেখ্য আমরা তাঁকে সবাই হুজুর বলে m‡¤^vab করতাম। তৎকালে নেতাদের আমরা কিভাবে ভক্তি শ্রদ্ধা করতাম এটা তার একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

৬০ এর দশকের শেষে তিনি পাঁচবিবিতে লালটুপি কৃষক সম্মেলন ডাকলেন। আমি পাকিস্তান প্রেসইন্টারন্যাশনাল (পিপিআই) এর প্রতিনিধি হিসাবে (তখন ইত্তেফাক বন্ধ ছিল) ঐ সম্মেলনে যোগ দেই। সেখানে যাওয়ার পর আমিসহ অন্যান্য সাংবাদিকদের খাওয়া দাওয়া হয়েছে কিনা খোঁজ নিলেন তিনি। সমাবেশে তিনি বক্তব্য রাখলেন। রীতিমত অগ্নিঝরা জ্বালাময়ী বক্তব্য।  সমাবেশটি পাকিস্তানী মিলিটারি ও পুলিশ দিয়ে ঘেরাও ছিল। ঘেরাও অবস্থায় তিনি জ্বালাময়ী বক্তব্য রেখে উপস্থিত জনতাকে জাগিয়ে তুললেন। তার সাহস দেখে আমিসহ অন্যান্য সাংবাদিকরা অবাক হলাম।

৩.

সম্ভবত ১৯৯২ সালের কথা। শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট রানা সিংগে প্রেমাদাসা বাংলাদেশ সফরের অংশ হিসাবে তিনি বগুড়ায় প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মীয় স্মৃতিবিজড়িত পুরাতত্ত্ব কেন্দ্রগুলো দেখতে আসেন। ইত্তেফাকের প্রতিনিধি হিসাবে আমি পেশাগত কাজে তার সফরস্থলে (গোবিন্দ ভিটায়) উপস্থিত হই। তিনি এ সময় তার জন্য তৈরি বিশেষ তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। আমি সব প্রটোকল ভেঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে তার তাঁবুর কাছে উপস্থিত হই। দেহরক্ষীরা আমাকে সরিয়ে দিতে উদ্যোগী হলে তিনি তাদের থামিয়ে আমার পরিচয় জেনে আমাকে কাছে ডেকে নেন। ফলের জুস দিয়ে আপ্যায়ন করেন। সুযোগ বুঝে আমি জিজ্ঞেস করি ÔHonorable President, what is your impression after visited Bangladesh and all the ancient Buddhist temple?Õ জবাবে ধবধবে সাদা লুংগী ও বিশেষ ধরনের জামা পরা প্রেসিডেন্ট রানাসিংগে প্রেমাদাসা বলেন- ÔI am very happy to say that all thethan Muslim Ruler successfully Preserve and Protect all this Place and ancient Buddhist temple, so I am great full all Past Muslim ruler in this country’. এটাই আমার প্রথম কোনো বিদেশী রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার গ্রহণ।

লেখক পরিচিতি- আমান উল্লাহ খান

সাবেক এমপি ও সম্পাদক, দৈনিক বাংলাদেশ