একজন মোনাজাতউদ্দিন-

যিনি ছিলেন সকল মানুষের

— সমুদ্র হক  

গ্রামীণ জীবনের সকল চিত্র সংবাদপত্রের পাতায় তুলে ধরে এ দেশে যিনি আগামীর সকল সংবাদ কর্মীর পথ প্রদর্শক হয়ে আছেন তিনি মোনাজাতউদ্দিন। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই নামটি হয়তো অচেনা। তবে সাংবাদিকতার ইতিহাসে তিনি মহীরুহ হয়ে থাকবেন অননত্ম কাল। বিশ্বের উন্নত দেশে জন্মালে তাঁকে নিয়ে গবেষণা চলতেই থাকতো। নানা কারনে বাংলাদেশে তা অনুপস্থিত। হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বছর অনত্মর মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি বা স্মারক পুরস্কারের বৃত্তের মধ্যেই তাঁকে আবদ্ধ করে রেখেছেন। যে মানুষ তাঁর জীবনের অনেকটা সময় বাংলার মাটির কাছে থেকে মাটির গন্ধে রিপোর্টিংকে সমৃদ্ধ করে গেছেন তাঁর পুরস্কার এতটুকুই! প্রতি বছর মৃত্যু বার্ষিকীর দিনে সংবাদপত্রের ভিতরের পাতায় ক্ষুদ্র পরিসরে কখনও ছাপা হয় কখনও তাও হয় না। আজকের দিনে ঢাকা থেকে প্রকাশিত পত্রিকায় রাজধানীর বাইরে থেকে সংবাদ প্রেরণ এতটাই সহজ যা ষাট সত্তরের দশকে ¯^‡cœ তো দূরে থাক কল্পনাতেও ছিল না। একটি মোডেম ও নোট বুক বা ল্যাপটপ কাছে থাকেল কে আর পায়। গোটা বিশ্ব হাতের মুঠোয়। এখন তো আই প্যাড গ্যালাক্সি সেল ফোন পকেটেই রাখা যায়। ছবি তোলর জন্য ক্যামেরার দরকার নেই। প্রিন্টের ঝামেলা নেই। সবই আজকাল উন্নত সেল (মোবাইল) ফোন করে দিচ্ছে। কোন টেনশন নেই। আজকের পৃথিবী কত ফাস্ট। দ্রুত এই পথ চলার শেকড় যারা তাঁদেরই একজন মোনাজাতউদ্দিন। এই পথে আসতে দূর্গম বন্ধুর পথ কতটা পাড়ি দিতে হয়েছে তার ছোট্ট আলোচনা –

সত্তরের দশকে দ্রুত সংবাদ প্রেরনে ছিল দু’টি পন্থা। ১. টেলিগ্রাম। ২. ট্রাঙ্ক কল। বর্তমান প্রজন্ম এই দু’টির প্রথমটি দেখেই নি। দ্বিতীয়টি চেনে ফিক্সড ফোন বা ল্যান্ড ফোন হিসাবে। টেবিলের ওপর ছয় ইঞ্চি মাপের j¤^v ছোট্ট একটি যন্ত্র। সামনের বোতামে চাপ দিয়ে টরে টক্কা টরে টক্কা শব্দ করে ইংরেজি বর্ন প্রেরণ করা হতো তারের মাধ্যমে। যিন রিসিভ করতেন তিনিও এই শব্দগুলো শুনে ইংরেজি বর্ন ক্রমানুযাযী সাজাতেন। এভাবে ইংরেজি শব্দ তৈরি হয়ে পরে ক্রিয়া পদ বিহীন সংক্ষেপ বাক্য তৈরি হতো।  টেলিগ্রাম গনত্মব্যে পৌঁছার পর  পিয়ন তা সংবাদপত্র অফিসে পৌঁছে দিতেন। বার্তা সম্পাদক বা উপ সম্পাদক তা পাঠ করে সংবাদ তৈরি করতেন। জরুরী সংবাদের ক্ষেত্রে সারা দেশে যে ক’জন সাংবাদিক টেলিগ্রাফ অফিস থেকে অতি অল্প খরচে টেলিগ্রাম পাঠানোর সূযোগ পেতেন তার মধ্যে মোনাজাতউদ্দিন অন্যতম। তাঁর নাম দেশের প্রতিটি টেলিগ্রাফ অফিসে লিপিবদ্ধ থাকতো। দ্বিতীয় পন্থা হলো ট্রাঙ্ক কল। অর্থাৎ টেলিফোনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থানে কথা বলতে অপারেটরের কাছে bv¤^vi দিতে হতো। তিনি বলতেন জরুরী না অর্ডিনারী। জরুরী হলে মাশুল বেশি। bv¤^vi বুক করার পর অপেক্ষার পালা। ২ ঘন্টা তিন ঘন্টা কখনও ৫/৬ ঘন্টাও লেগে যেত। তারপর মাহেন্দ্র ক্ষনে সংযোগ মেলার পর যত জোরে চিৎকার করা সম্ভব সেই ভোকালে কথা বলে সংক্ষেপে ঘটনা বলা। এখানেও মাঝে মধ্যে বিপত্তি ঘটতো। উচ্চারণরন করা হলো একটা। উনি শুনলেন আরেকটা। পরদিন ভুল ছাপা হলে আর যাবে কোথায়! ছোট্ট দুটি উদাহারণ নিশ্চয়ই বলে দেয় কতটা প্রতিকূলতার মধ্যে জরুরী সংবাদ প্রেরণ করতে হতো। এই কাজটিই অনেক ধৈর্য ধরে করতেন মোনাজাতউদ্দিন। বাকি চলমান রিপোর্টগুলো ডাক বিভাগের মাধ্যমে পাঠাতেন। অনেক পরে আশির দশকের শুরুতে কুরিয়ার সার্ভিস চালু হলে ইনডেপথ রিপোর্ট এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট ইন্টারপ্রিটেটিভ রিপোর্ট  কখনও স্কুপ রিপোর্টও কুরিয়ারে পাঠাতেন তিনি। আরও পরে ফ্যাক্স চালু হলে হাতে লিখে দিনের রিপোর্ট দিনেই পাঠাতেন।

এই রিপোর্ট পাঠানোর আগে তা তৈরিতে কোন আপোস করতেন না মোনাজাতউদ্দিন। ঘটনা স্থলে গিয়ে সরেজমিনে সব কিছুই দেখে ও লোকজনের সঙ্গে কথা বলে তবেই  রিপোর্ট  লিখতে বসতেন। দেশের দূর্গম অঞ্চলে তিনি মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন। আজকের মতো এত পাকা সড়ক ছিল না। বাস সার্ভিসও ছিল কম। তাঁর সঙ্গে থাকতো একটি ক্যামেরা। সে দিনের সাদা কালো ফিল্মের ক্যামেরা দিয়ে তিনি যে ছবি তুলতেন তা আজকের বড় ফটো সাংবাদিকরা ডিজিটাল ক্যামেরায় রঙিন ভূবনে তা কতটা পারেন এ নিয়েও হতে পারে গবেষণা। মোনাজাতউদ্দিনের সিংহভাগ রিপোর্টের সঙ্গে থাকতো ছবি। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় তিনি কতটা গভীরে যেতে পারতেন তার তুলনা তিনি নিজেই। দূর্গম এলাকায় গিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়ে একেবারে হাড়ির খবর বের করে আনতেন। তাঁর লেখার ভাষা শৈলীতে থাকেতা গ্রামীণ পটভূমির ছাপ। দুনীতির খবর সংগ্রহে তিনি এতটাই কৌশলী ছিলেন যে প্রয়োজনে অভিনয়ও করতে হতো। এমনও দেখা গেছে যার হাতে দুর্নীতি হয়েছে তিনিও অবচেতনে কখন সঠিক তথ্য দিলেন তা বুঝতেই পারতেন না। এখানেই ছিল মোজাতউদ্দিনের মুন্সিয়ানা।

এই মহিরুহ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সূযোগ হয়েছিল আমার দৈনিক জনকেণ্ঠই। এর আগে যখন তিনি সংবাদে তখন থেকেই তাঁর কাজের সঙ্গে পরিচিতি। প্রথমে পাঠক পরে সাংবাদিকতায়। তিনি কাজ করেন সংবাদ পত্রিকায়। আমি শুরুতে স্থানীয় দৈনিক উত্তরবার্তা পরে ঢাকার বিভিন্ন ফিচার সার্ভিসে। কিছু সময়ের জন্য ডেইলি স্টারে।  লেখালেখির মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রপাতে দেখেছি তিনি সব সময়  উৎসাহ দিতেন এবং  সাংবাদিকতাকে উন্নত করতে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি করে দিতেন অগোচরেই। এভাবে কৌশলী পরীক্ষা নিয়ে দেখতেন কতটা ধৈর্য লালন করি আমরা। এরপর সঙ্গে নিয়ে যেতেন দূর্গম পথের গ্রামে। সাংবাদিকতা কতটা শেখার ও কতটা জানার এবং সর্বপরি কতটা মেধার সঙ্গে শারিরীক শ্রম দিতে হয় তা  শেখাতেন তিনি। এই পরীক্ষায় তাঁর সঙ্গে যারা উত্তীর্ন হতে পেরেছেন তারাই টিকে গেছেন। এই জায়গাটিতে আজ অনেকের

কাছে তিনি রোল মডেল। তিনি জনকন্ঠে আসার আগেই তার সঙ্গে ঘুরেছি। হাসির ঘটনাও আছে অনেক। তবে তা অবশ্যই সাংবাদিকতার ফিল্ডে। ১৯৯৩ সালে দৈনিক জনকণ্ঠ প্রকাশের এক মাস আগে যখন জনকন্ঠে যোগদানের জন্য যাই তখন সংবাদ অফিসে মোনাজাতউদ্দিনের কাছে গিয়ে বললম। তিনি এতটাই আনন্দিত হলেন যে বসতে না দিয়ে বললেন আগে যোগদান করে আসেন তারপর কথা। এরপর শুরু হলো দুই প্রবীণ নবীন সাংবাদিকের প্রতিযোগিতা। মিষ্টি এই প্রতিযোগিতা এতটাই মধুর ছিল যা আরও কাছে নিয়ে আসে। একটা পর্যায়ে ১৯৯৪ সালে মোনাজাতউদ্দিন সংবাদ ছেড়ে জনকন্ঠে যোগদান করেন উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি হিসাবে। বগুড়া অফিসেই তিনি এ্যাটাচড ছিলেন। শুরু হলো একসঙ্গে কাজ করার পালা। তিনি বগুড়ায় যোগদানের পর মনে হয় আমি কিছুটা হালকা হলাম। অত টেনশন আর নেই। মনে পড়ে তাঁর কথা। একদিন বললেন ‘কি সমুদ্র আমাকে এভাবে ফেলে কই যান।’ (তিনি সকলকে আপনি সন্মোধন করতেন। শত চেষ্টাতেও তুমি সম্মোধন আদায় করতে পারি নি)। সেদিন বলেছিলাম ‘ভাই এভাবে বলছেন কেন। বড় ভাই থাকলে ছোট ভাই তো একটু ভার মুক্ত হয়ই।’ তিনি হেসে বললেন  ‘আপনি যে কারনে এই সময়টায় বাইরে যান একই কারনে আমিও যেতে চাই।’ ওই সময়ে সন্ধ্যে ৭ টা থেকে ৮ টা ভারতীয় জি টিভি পরীক্ষামূলক ভাবে বাংলা ভাষার অনুষ্ঠান চালু করে। সপ্তাহে ৫ দিন। এই এক ঘন্টার অনুষ্ঠানে বিজ্ঞাপন সহ আধা ঘন্টা করে দুইটি অনুষ্ঠান এতটাই আকর্ষণীয় ছিল যা দর্শকদের কাছে টেনে নেয়। পরে আমরা যেতাম অনুষ্ঠান দেখতে। আমাদের অফিসে কোন টেলিভিশন ছিল না। অনুষ্ঠান থেকেও যে সাংবাদিকতার কত কিছু শেখা যায় তা হতে কলমে দেখিয়ে দিতেন মোনাজাতউদ্দিন। কৃষি ভিত্তিক রিপোর্টিংয়ে তো তিনি আনপ্যারালাল। অমর হয়ে আছেন। গ্রামীণ জীবনের কৃষকের হৃদয়ের ব্যাকুল কথাগুলো মোনাজাতউদ্দিনের কলম থেকেই বের হতো। মনে পড়ে ৯৪ সালে শীতের সময়ে আমরা রংপুরের কয়েকটি এলাকায় গিয়ে যা দেখলাম তার বর্ননা দিয়ে মোনাজাত ভাই হেডিং দিলেন ‘খাদ্য বস্ত্র পাঠান মানুষ বাঁচান।’ পরদিন খবরটি প্রকাশ হওয়ার সঙ্গেই তৎকালিন প্রধান মন্ত্রীর নির্দেশে দ্রুত হেলিকপ্টারে করে খাদ্য ও শীত বস্ত্র পাঠানো হলো এলাকায়। যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মানের শুরুতে সয়েদাবাদ এলাকায় কিভাবে লোকজন সরকারের কাছ থেকে টাকা আদায়ের ফন্দি হিসাবে রাতারাতি ঘর তুলে কথিত মিল ফ্যাক্টরির নাম দিয়ে কিই না তুলকালাম কান্ড করেছিল। রাতে বগুড়া থেকে মাইক্রোবাসে করে রওনা দিয়ে সিরাজগঞ্জ পৌঁছে পরিচিত একজনের বাড়িতে থেকে পরদিন ভোরে ছোট ছালার ব্যাগে জমি পরিচর্যার পাচুন ও খুড়পি নিয়ে জমিতে গিয়ে কামলা সেজে গোপনে ছবি তুলে আনা হয়। এই কাজ করতে গিয়ে ওই অঞ্চলের কৃষকের রিহার্সেলও দিতে হয়। মোনাজাত ভাইয়ের পদার্পন যেহেতু ছিল গোটা উত্তরাঞ্চলের প্রতিটি এলাকা যে কারনে সকল এলাকার মানুষের চলাফেরা ও ভাষা ছির তাঁর দখলে। সয়েদাবাদে গিয়ে সেই টেকনিক ফলো করা হলো। তবে কথা কম। ইশারা বেশি। এর কারণ বেশি কথা বলতে গেলে যদি হঠাৎ কোন ভুল বের হয়ে যায় তাহলেই সব পন্ড। বেকায়দার পড়লে অন্য কিছু ঘটতেও পারে। সেদিন বেশ সফলতার সঙ্গেই ছবি তুলে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে ওদের গোপন অভিসন্ধি গুলো জানা হয়। ফিরে আসার পর মোনাজাত ভাইকে বললাম, আপনি অভিনেতা হলেও প্রথম সারিতে নিশ্চিত থাকতেন। তাঁর উত্তর ছিল সাংবাদিকতা এমন একটা পেশা যেখানে অভিনয়টাও বড় কাজ দেয়। যখন যেখানে যে অভিনয় প্রয়োজন তা সফলতার সঙ্গে করতে পারলে এবং আরেক পক্ষ ধরতে না পারলে স্কুপ রিপোর্ট তৈরির মেটিরিয়ালস জোগার হয়ে যায়। এর সঙ্গে আরেবটি বিষয় অবশ্যই দরকার ‘শার্প মেমোরি’। অনেক সময় কারও কথা, কোন তথ্য লেখা বা রেকর্ড করার কোন সূযোগই থাকে না। এ সময় শুধুই m¤^j মেমোরি। যার মেমোরির ধারন ক্ষমতা যত বেশি সে ততটাই সফল। তাঁর এই শিক্ষা পরবর্ত্তী জীবনে আমার যে কতটা উপকারে এসেছে তা আমার পেশাগত অধ্যায়ে অনুভব করি প্রতিটি মুহূর্তে। আমরা সাংবাদিকতার ভূবনে হারিয়েছি এক নক্ষত্রকে। মোনাজাতউদ্দিন যুগে যুগে আসে না। একবারই আসে। এই মহীরুহকে ধরে রাখার দায়িত্ব শুধু সাংবাদিকদের নয় সকলের। যিনি ছিলেন সকল মানুষের হৃদয়ের সুর। 

                                              

লেখক পরিচিতি: সমুদ্র হক

দৈনিক জনকন্ঠের সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার