——

একুশের চেতনা ও সাংবাদিকতায়

মাতৃভাষার ব্যবহার

ড. ত্বাইফ মামুন    

 

ফাগুনের আগুন ঝরা দিনে কয়েকটি লাল পলাশের আত্মাহুতির রক্তে রঞ্জিত ঢাকার রাজপথ বাঙালির স্বত্ত্বার গভীরে লুকিয়ে থাকা চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে বাঙালিই প্রথম জাতি যাঁরা তাঁদের মাতৃভাষার সম্মান রক্ষর্থে রাজপথ সিক্ত করেছে বুকের তাজা রক্তে। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহাসিক ইতিহাসে ৫২’র একুশে ফেব্র“য়ারি একটি সুবর্ণ সংযোজন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত ইতিহাস পরিক্রমা পর্যালোচনায় বাঙালির মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠাল আন্দোলন- সংগ্রামের অগ্নি-উন্মাদনার দিনগুলো আমাদের পরবর্তী স্বাধীনতা ও স্বাধীকার চেতনার সুতিকাগার হিসেবে কাজ করছে। ৫২ থেকে ১৯৭১; এ দীর্ঘ সময়ে বাঙালীর মননকে স্বাধীনতাকেন্দ্রিক করতে বিশেষ ভূমিকার অংশ হিসেবে নিরলস কাজ করেছেন সাংবাদিক। যদিও বাংলা ভাষায় সাংবাদিকতার ইতিহাস আধুনিককালের শুরু থেকেই। কিন্তু বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে সাংবাদিকতার উপাদান করতে একুশের চেতনা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। বিশেষত ১৯৪৭ পরবর্তী দেশ বিভাগের পর ১৯৫২ এর একুশ এ- স্বপ্নযাত্রাকে প্রাণময় গতি দিয়েছে। মনে করা হয়, জাতি গঠণে দুটি উপাদানকে উর্বর মননশীলতা এবং নৈতিক পরিশুদ্ধ চেতনায় উজ্জিবীত হতে হয়; তাঁরা হলেন শিক্ষক ও সাংবাদিক। বর্তমান নিবন্ধে এ কথা প্রাসঙ্গিক যে, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে শিক্ষক ও সাংবাদিকের সত্ত্বা ছিল পরিপূরক। অবশ্য পরবর্তীতে এ ধারণাটি পরিবর্তিত হয়েছে। কারণ পরিবর্তিত সময়ের প্রয়োজনে পেশাগত দিক থেকে সাংবাদিকতা ও শিক্ষকতা আলাদা মেজাজে উপস্থাপিত হতে দেখা যায়। ১৯৪৮ এর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকেন্দ্রিক যে বলয় তৈরি হয়েছিল তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো- বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিকের মূল জায়গাটি ছিল সাংবাদিকতা। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে এবং তদানিন্তন পাক শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে সাংবাদিকদের কলম শাণিত তরবারির মত কাজ করেছে। নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চার মধ্য দিয়ে যে কোন জাতি তার অস্তিত্বের জানান দিয়ে থাকে। একুশের চেতনা রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করলেও জাতির মেধা এবং অস্তিত্বের জায়গা বিনির্মাণে এটি ছিল একটি মাইলফলক। পাকিস্তানী শোষণ ও শাসন দীর্ঘায়িত করতে উর্দুকে বাঙালির উপর চাপিয়ে দেবার ষড়যন্ত্র আমরা প্রত্যক্ষ করেছি তার প্রক্রিয়াকে রুখে দিতে না পারলে বাঙালি তার শ্রেষ্ট সন্তান ও মেধাবি প্রজন্ম হারাত। মেধাশূণ্যতা থেকে বাঙালিকে রক্ষার ঐতিহাসিক চেতনার নাম ৫২’র একুশ। মাতৃভাষা হিসেবে বাংলাকে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আমরা জাতিগত চেতনায় এগিয়ে যাবার প্রেরণা পেয়েছি। ১৯৫২ এবং তার পরবর্তী সময়ে বাঙালিকে এগিয়ে নিতে যেসব বুদ্ধিজীবি পেরণাদাত্রী হিসেবে অগ্রণী হয়েছিলেন তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। জহীর রায়হান, শহীদুল্লাহ কায়সার, মুনীর চৌধুরী- এঁরা ৫২ কেন্দ্রিক উঠে আসা সাংবাদিকতা, সাহিত্যচর্চা ও নির্মাতা হিসেবে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের এক একটি নাম। একুশের যে চেতনা বাংলাকে সকল স্তরে ব্যবহারের স্বপ্ন দেখিয়েছিল সেটি প্রথম এবং সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করেছিল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে। সাংবাদিকতায় মাতৃভাষার ব্যবহার বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে- একথা অনস্বীকার্য। ১৯৪৭ পরবর্তী বাংলা সাহিত্যচর্চায় যাঁরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ভূমিকা রেখেছেন তাঁরা সবাই ব্যক্তিজীবনে সংবাদপত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। দ্বিজাতি তত্ত্বে ধর্ম যেভাবে কাজ করেছে; পূর্ব বাংলার মানুষরা কিছুদিন পরই উপলব্দি করেছিল যে, সে মন্ত্রটি আসলে ছিল শুভঙ্করের ফাঁকি। তাই কার্জন হলে জিন্নাহর রাষ্ট্রভাষা কেন্দ্র্রিক সেই একপেষে বক্তব্য বাঙালির চেতনার শোনিতে আগুন ধরিয়েছিল। বাংলাদেশে তদানিন্তন পশ্চিম পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করার যে গণরোষ সংক্রমিত হয়েছিল সেখানে তৎকালীন বাঙালি সাংবাদিকদের ভূমিকা অবিসংবাদিত। পাক শাসনের দুঃসময়ে সাংবাদিকরা মাতৃভাষায় সংবাদ পরিবেশন করে বাঙালিকে ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সময়কালের নানা টানাপোড়েন ও সংগ্রামের সূর্য-সারথি হয়েছেন। একুশের চেতনা সেইসব মেধাবিদের আন্দোলিকত করেছিল বলেই আজকের স্বাধীনতা এবং তার সুখ-ভোগ। তাই বলা হয়, একুশ আমাদের উপহার দিয়েছে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা, জাতি হিসেবে বাঙালি এবং যুগিয়েছে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অবর্তীর্ণ হবার অগ্নিসাহস।

এটি অনস্বীকার্য বিষয়- যে লোক যে ভাষাতে জন্ম থেকেই চুক্তিবদ্ধ হয়, সে ভাষাই তার মাতৃভাষা। সে ভাষা তার দেহের রক্ত মাংসের মতই একান্ত নিজের। আমরা যা কিছু অনুভব করি, যা কিছু ভাবি, তা এই ভাষার মাধ্যমেই হয়। কাজেই ভাষা হচ্ছে জীবনানুভূতির বাহন, বেশী করে বললে বলতে হয়, ভাষাই জীবন। তাহলে মাতৃভাষা থেকে বিচ্যুত হওয়া মানে অনেকাংশে জীবনকে খন্ডিত করা,  ক্ষুদ্র করা, হয়তোবা ব্যর্থ করা। কচ্ছপকে উল্টিয়ে দিলে যেমন সে চলতে না পেরে, না খেতে পেরে মারা যাবে, তেমনি মানুষের মুখের ভাষা-ভাব-ভাবনার ভাষা কোনো কৌশলে ভুলিয়ে দিলে মানুষ হিসেবে তার অপমৃত্যু অনিবার্য। এই অনিবার্যতা থেকে রক্ষা করেছে একুশ। আর সাংবাদিকেরা সে রক্ষার সূর্যসৈনিকের ভূমিকায় ছিলেন।

প্রাসঙ্গিত কারণেই ৫২-এর ভাষা আন্দোলন কী কারণে ব্যতিক্রমী চেতনার সে সম্পর্কে দু-একটি ঐতিহাসিক তথ্যের সংযোজন করছি। তুরস্কে কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে নব জাগ্রত তুরস্ক লিপি পরিবর্তন এবং বিশুদ্ধ তুর্কিভাষা প্রচলনের প্রয়াসে সাফল্য লাভ করে, চীনে মাওসেতুং এর নেতৃত্বে লিপি সহজীকরণ ও মাতৃভাষাকে জীবনের সর্বস্তরে প্রচলনের সাধনায় কৃতকার্য হয়,

রাশিয়ায় লেনিন ও স্টালিনের নেতৃত্বে জাতিগত ভাষা সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়, ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্নের আন্তরিক প্রয়াসে ভাষা ইন্দোনেশিয়া সর্বজনগ্রাহ্য জাতীয় ভাষায় পরিণত হয়। মালয়েশিয়ায়, জাপানে, লিবিয়ায়, সুদানে, গ্রীসে, ইসরায়েলে, বেলজিয়ামে, নরওয়েতে, আয়ারল্যান্ডে ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। বিভিন্ন দেশে এসব আন্দোলনের মধ্যে ছোটখাট বৈশিষ্ঠগত ভিন্নতা লক্ষ্য করা গেলেও মৌলিক উদ্দেশ্য কোন ব্যত্যয় লক্ষ্য করা যায় না। উদ্দেশ্যটি হচ্ছে, মাতৃভাষাকে আত্মমর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা এবং উপনিবিষ্ট ভাষার নিপীড়ন ও দুর্গতির হাত থেকে রেহাই পাওয়া। আফ্রো-এশিয়া ও ল্যাটিন- আমেরিকার নতুন রাষ্ট্রগুলোর ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রেও মাতৃভাষার বিজয় সুনিশ্চিত ভাবে দেখা গেছে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের চরিত্রগত মৌলিক পার্থক্য নেই। মাতৃভাষাকে আত্মমর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের এও একটি অংশ। কিন্তু মাতৃভাষাকে স্বকীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এ আন্দোলনের ভূমিকা অনন্য এবং অভূতপূর্ব। কারণ অন্যান্য দেশের জাতীয় জাগরণ ও মাতৃভাষা সচেতনাকে নিয়ে সরকার ও জনগনের মধ্যে কোন রকম বৈরিতামূলক দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়নি। বাংলা ভাষাকে নিয়ে তার সূত্রপাত হয়েছে। অন্যান্য দেশেও ভাষা বিভেদ অবশ্যই আছে। পরিভাষার যথার্থ নিয়ে, লিপি সহজীকরণ নিয়ে, ভাষার বিশুদ্ধ প্রয়োগ-প্রযুক্তি নিয়ে, ভাষা পুনরুজ্জীবন নিয়ে, সাধারণ ভাষা সংগঠন নিয়ে, অনেক দেশেই জনগণের মধ্যে ছোটখাট বিভেদ আছে; কিন্তু মাতৃভাষার উৎকর্ষ কামনার মৌল প্রশ্নে তাদের মধ্যে কোন বিভেদ নেই। ৫২ এর একুশে ফেব্র“য়ারির প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন ধরণের। এখানে মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে সরকার ও জনগণের মধ্যে বৈরিতামূলক দ্বন্দ্বের সূচনা হয়েছে এবং প্রতিক্রিয়াশীল গণবিরোধী সরকারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ্য সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে প্রাণের বিনিময়ে মাতৃভাষার অধিকার সংরক্ষণ করতে হয়েছে। এখানেই বিশ্বের ভাষা- আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে বাংলাভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের পার্থক্য। বাংলা ভাষা আন্দোলনের চরিত্রগত এ ভিন্নতার সামান্য কারণ ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভৌগলিক অবস্থানের অস্বাভাবিকতা, এ দু-অঞ্চলের মধ্যকার আপাত: অস্পষ্ট উপন্যবেশিক কাঠামো, পিতৃস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মূর্খতা, ধর্মভিত্তিক জাতীয়তা গঠনের অপপ্রয়াসের ভন্ডামি এবং পূর্ব বাংলার অভ্যন্তরীণ দালালদের বিশ্বাসঘাতকতা এ- আন্দোলনের ইতিহাসকে অনন্যতা দান করেছে।

একুশের আন্দোলনকে শুধু ভাষা- আন্দোলন মনে করলে যথাযথ হবে না। এ আন্দোলন সত্যিকার অর্থে এদেশের জনগণের মুক্তি সংগ্রামের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি সংগ্রামের আন্দোলন। এ করণেই বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের ক্ষেত্রে একুশের আন্দোলনের অবদান সুদূর প্রসারী। আর একুশ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সব সংগ্রামেই বাঙালি একুশের চেতনার বটবৃক্ষতলে সমান্বিত করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন যাঁরা, তাদের মধ্যে সাংবাদিকদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। ইতিহাস এ পরিক্রমার অনন্য স্বাক্ষী। ভাষার দাবীতে সংগ্রাম, আত্মাহুতি ও দীর্ঘ যন্ত্রণার পথ-পরিক্রমা সবই বাঙালিকে বিশ্ববাসীর কাছে এক মর্যাদাপূর্ণ জাতিতে পরিণত করেছে। অনেকপরে হলেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে এ ব্যাপারে। তার ফলে বাঙালির উপর বাংলা চর্চার দায়ও বেড়েছে অনেক। বাংলাভাষি হিসেবে সেটির ব্যবহার আমরা সব সময়ই করছি। কিন্তু শুদ্ধ বাংলা ব্যবহারে কতটা পরিশীলিত হয়েছি সেটি এখনো একটি প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়। ১৯৭১ পরবর্তী সংবাদপত্রে বাংলার ব্যবহারে একুশের মৌল চেতনাকে ধরে টান দেয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রে বাঙালিকে যেভাবে উজ্জীবিত করা হয়েছিল, সেটির জন্য আমরা একুশের কাছে মাথা নত করতে বাধ্য। কিন্তু বাঙালির এ দুটি বিশাল অর্জন মুক্তিযুদ্ধের এতদিন পর এসে ক্ষয়িষ্ণু হতে দেখা যাচ্ছে। একটি বিষয় প্রাসঙ্গিক যে, পৃথিবীর সব দেশেই নিজ নিজ মাতৃভাষার ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় সেই ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রে। সুতরাং ভাষার শ্রীবৃদ্ধিতেও প্রাত্যহিক ভূমিকায় থাকে সংবাদপত্র। শুদ্ধ বানান ও পরিশালিত বাক্য কাঠামো যে কোনো ভাষার উৎকর্ষের প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। সে ক্ষেত্রে যে একুশ এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলা ভাষাকে আমাদের করেছে, সে ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতায় মাতৃভাষার ব্যবহার এখন বিশেষ কোনো প্রসঙ্গ নাও হতে পারে; কিন্তু অনেক সংবাদপত্রে ব্যবহৃত অশুদ্ধ বানান এবং বিকৃত বাক্য কাঠামো বাংলা ভাষার শ্রীকে যেভাবে বিনষ্ট করছে ঠিক সেভাবে একুশের চেতনাও ভূলুন্ঠিত হচ্ছে। অবশ্য এসবের কারণ হিসেবে সংবাপত্রের দায়িত্বহীনতাও দায়ী। একুশের চেতনা সর্বস্তরের বাংলা ব্যবহার করার প্রথম যে অভিক্ষেপ আমরা লক্ষ্য করেছি তা মূলত সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু করেছিল। সঙ্গত কারণেই বাংলা ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার যদি সংবাদপত্রেই নিশ্চিত না হয়, তবে তা বাঙালির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। এক্ষেত্রে নিজ ভাষা সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করলে ভাল হয়। 

৫২’এর ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয় ঐক্যের বিষয়টিকে বিশ্ববাসীর কাছে অপরাজেয় স্মারকে পরিণত করেছিল। রাজধানী থেকে মফস্বল পর্যন্ত বাঙালি-মননে পাক-বিরোধী চেতনা সৃষ্টি করতে তৎকালীন সাংবাদিকদের ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহারে আন্তরিকতা ও মাতৃভাষার প্রতি নিষ্ঠা ছিল বলেই প্রবল জনমত তৈরি হয়েছিল সে সময়ের উত্তাল দিনগুলোতে। বর্তমান সংবাদপত্রে এবং সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে যে নৈতিক দিক পরিবর্তিত হয়েছে তা হল; জাতীয় ঐক্য রক্ষায় এ- প্রতিষ্ঠান সংশিষ্ঠরা একুশের সেই ঐতিহাসিক চেতনাকে লালন করছে না। বরং সাংবাদিক এবং সংবাদপত্র কখনো কখনো নষ্ট রাজনৈতিক দলবাজির মূখপত্র হিসেবে কাজ করছে। ফলে বস্তুনিষ্ঠতার পরিবর্তে অসাধু চেতনার প্রসার ঘটছে এবং জাতি বির্নিমাণের পরিবর্তে ধ্বংস হচ্ছে নৈতিক মূল্যবোধ।

সাংবাদিকতায় একুশের চেতনা উপযুক্ত অনৈতিক শিক্ষা অবশ্যই দেয় না। কিন্তু যা ঘটছে সেটি কি প্রশ্নবিদ্ধতা তৈরি করছে না?

সাংবাদিকতায় এ রকম অনুর্বর চর্চা চলছে বলেই নির্মল সেনের মত সাহসী ও নৈতিক মূলবোধসম্পন্ন সাংবাদিকেরা দূর্লভ হচ্ছেন ক্রমশ:। বোধহয় এটিই আজকের বাস্তবতা।

মফস্বল সৎ সাংবাদিকতার উদাহরণ হিসেবে আমরা প্রায়শই মোনাজাত উদ্দীনের প্রসঙ্গ বলতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। কিন্তু পরিবর্তিত দিন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে মোনাজাত উদ্দীনের সেই সততাকে কতটা লালন করেছে সেটা দেখবার সময় এসেছে। ধরা যাক, একটি সংবাদ; যেখানে রাজনৈতিক সংশিশ্লষ্ঠতা রয়েছে, সেটি পরিবেশনের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন সংবাদপত্রে ভিন্ন রকমের লক্ষ করা যায়। কারণ পক্ষপাততুষ্টতায় নিমজ্জিত বস্তুনিষ্ঠতা। সত্য কোনটি সেটি আবিস্কারই মহা সংকটের বিষয়।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রয়েছে বলা হয়; কিন্তু সত্য তার নিজস্ব স্বাধীনতায় প্রকাশ হতে চায়। একজন সাংবাদিক যদি সত্যের এ-সমীকরণটি এক মাত্রায় সন্নিবেশ করতে পারে তাহলেই মূল্যবোধের যথার্থ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। একুশের চেতনায় মূল্যবোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ছিল- বাঙালি হিসেবে এটি আমরা অস্বীকার করতে পারি না। একুশের চেতনা বাঙালি জাতিকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে শিখিয়েছিল। আর সাংবাদিকরাই সে সময়ে এ চেতনার সংক্রমন ঘটিয়েছিল লোক থেকে লোকান্তরে। পাল্টানো এ সময়েও সৎ-সাংবাদিকেরা বর্তমানের অসঙ্গতিকে তুলে ধরে সঙ্গতিপূর্ণ বাস্তবকে নির্মানে সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। উল্টো চিত্রও অহরহ। সত্যতথ্য গোপন, অসত্যকে সত্যে পরিণত, অসৎ পথে উপার্জন- এসব চিত্রও প্রতিনিয়ত সাংবাদিক সমাজকে গ্লানিযুক্ত করেছে। জাতির বিবেক হিসেবে পরিচিত সংবাদিকতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে- ৫২ থেকে ৭১ পর্যন্ত সময়ে বাংলাকে যাঁরা সাংবাদিকতার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তাঁরা ছিলেন শিক্ষিত ও পরিশীলিত মননের।

বর্তমানে নেতিবাচক প্রসঙ্গ থাকলেও সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্তদের থেকে প্রাপ্ত বাংলাদেশের অর্জনই সবচেয়ে বেশী। দেশ বিভাগের পর থেকে বাঙালির যে কোন আন্দোলন সংগ্রামে এগিয়ে যাবার চেতনাকে অগ্রগামী করেছে সাংবাদিকরাই। তাঁদের কলম রণক্ষেত্রে সাহসী যোদ্ধার মত কাজ করেছে নিরন্তর। তাঁদের ত্যাগও বাঙালিকে ঋণী করেছে অনন্ত কালের জন্য।

একুশে ফেব্র“য়ারির আবেগ ও ঐক্য থেকে পরবর্তীকালে জনসাধারণের রাজনৈতিক চেতনা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠাণের উদ্ভব ও বিকাশ যেমন সম্ভবপর হয়েছিল, সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও অনুরূপ আলোড়ন ঘটেছে। একুশে ফেব্র“য়ারির আত্মত্যাগ সারা দেশে এক ব্যাপক সাংস্কৃতিক চেতনার সংস্কার করেছে। এর সহজ প্রমাণ পাওয়া যাবে ভাষা আন্দোলনের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সাংস্কৃতিক সম্মেলন প্রভৃতির পারস্পারিক সাফল্যর তুলনা করলে। বাঙালির এই সাংস্কৃতিক চেতনার অগ্রযাত্রায় প্রধান ভূমিকা রেখেছিল তখনকার সাংবাদিক সমাজ। ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি দেশের বৃহত্তম জনপ্রবাহের এই উন্মুখ চেতনা ও সমর্থন সৃষ্টিতে কাজ করেছে তদানিন্তন সাংবাদিক ও লেখকরা। ফলে এর থেকে সৃষ্ট মনন প্রেরণা দিয়েছে সৃষ্টিতে। আর সাধারণ মানুষকেও দিয়েছে সংস্কৃতিক সাধনার এর্ষণা।

৫২ এর একুশ পরবর্তী সময়ে তাই বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সমাবেশ ঘটেছে, উদ্ভব হয়েছে ছোট বড় নানা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠাণের এবং আবির্ভাব ঘটেছে নানা পত্রিকার। একুশের চেতনা এবং বাংলা ভাষায় সাংবাদিকতার ফলেই এ জাগরণ সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হয়। সবশেষে এটা স্বীকার্য যে, আজকের যে বাংলা সংস্কৃতির প্রাণবন্ত ধারা দেখা যাচ্ছে তাও সে সময়ের সাংবাদিক ও লেখকদের কল্যানকামী ও হীতাকাঙ্খী চেতনার থেকে উৎসারিত ফসল।

লেখক পরিচিতি: ড. ত্বাইফ মামুন

সহকারী অধ্যাপক, বাংলা

সরকারী মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজ, বগুড়া