—————–

চাটমোহরের সংবাদপত্র ও

সাংবাদিকতার সেকাল-একাল

  আব্দুল মান্নান পলাশ    

চাটমোহর। পাবনা জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের তথ্য বাতায়নে একটি উজ্জ্বল নাম। চাটাইয়ের ওপর মোহর ঢেলে গোনা হতো বলে স্থাননাম হয়েছিলো চাটমহর। কালের দোলাচলে সেই নামটি এখন চাটমোহরে পরিনত হয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড়বিল ‘চলনবিল’ এই উপজেলার পাশ দিয়ে বহমান। সম্রাট আকবরের পদচিহৃ রয়েছে এখানকার মাটিতে। বাংলা সাহিত্যের বিশুদ্ধ পুরুষ প্রমথনাথ চৌধুরীর পিতৃস্থান এই চাটমোহরে। মরা বড়াল, গুমানী, চিকনাই, করতোয়া নদীর বহমান ক্ষীনধারা এখনো সমৃদ্ধ একদার হিন্দু অধ্যুষিত বধিষ্ণু জনপদটি। এখানকার সাহিত্য-সংস্কৃতি, সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ফল্গুধারা সেকাল থেকে একালে এসে আরো পরিপুষ্ট। নিরীহ-শান্তিপ্রিয় এখানকার জনমানস প্রগতির চেতনায় এখনো ঋদ্ধ।

সংবাদপত্রে সেকালঃ ১৪০ বছর আগে অর্থাৎ ১৮৭৩ সালে সাপ্তাহিক ‘জ্ঞানবিকাশিনী’ নামে প্রথম একটি পত্রিকার মাধ্যমে এখানকার সংবাদপত্রের পথচলা শুরু হয়েছিলো। সে চলা আরো বেগবান হয়েছে। পত্রিকাটির তত্বাবধায়ক হিসাবে ছিলেন মহিম চন্দ্র চক্রবর্তী। আর সম্পাদনা করতেন গুনাইগাছা(বর্তমানে ইউনিয়নের নাম) গ্রামের ভৈরব নাথ সিদ্ধান্ত। আর এখানকার শ্রীধর রায় ছিলেন জ্ঞানবিকাশিনীর প্রকাশক। আবার জ্ঞানবিকাশিনীর প্রেসে ১৮৭৩ সালে ‘মাসিক পল্লী দর্পন’ নামের একটি কাগজ বের করেন হরিপুরের ঈশান চন্দ্র চক্রবর্তী। এছাড়া চাটমোহরের হরিপুরের প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত ১৯১৪ সালে প্রকাশিত ‘সবুজপত্র’। একই সময়ে হরিপুরের যোগেন্দ্রনাথ চৌধুরী সম্পাদিত ও প্রকাশিত  ইংরেজী সাপ্তাহিক ‘ ক্যালকাটা উইকলি নোটস’ প্রকাশিত হয় কলকাতা থেকে। এরপর অনেক সাহিত্য-সাময়িকী, ম্যাগাজিন প্রকাশিত হলেও কোন সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে কিনা তার কোন দালিলীক প্রমান পাওয়া যায় না।

সংবাদপত্রে একালঃ ১৪০ পেরিয়ে, পরবর্তী ১০০ বছরের প্রান্তে আমরা আবার দেখি এখানে ২০ বছর আগে, ১৯৯৩ সালের ১৩ মার্চ বের হয়েছে ‘ চাটমোহর বার্তা’ নামে একটি সাপ্তাহিক কাগজ। দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা নিয়ে পত্রিকাটি প্রকাশ করেন এসএম হাবিবুর রহমান। অনিয়মিত হলেও পত্রিকাটি এখনো বেঁচে আছে। ২০০৮ সালের ২৪ মার্চ প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘সময় অসময়’। সাপ্তাহিকীটির সম্পাদনা ও প্রকাশনায় রয়েছেন সাংবাদিক কেএম বেলাল হোসেন স্বপন। একই বছরের ২৬ মার্চ পাবনা থেকে প্রকাশিত পাপিয়া আক্তার মলির ‘সাপ্তাহিক ছন্দা’ চুক্তির মাধ্যমে এনে সাংবাদিক হেলালুর রহমান জুয়েল এখান থেকে প্রকাশ করেন। ৩ বছর প্রকাশের পর চুক্তির মেয়াদ শেষে পত্রিকাটি আবার পাবনায় ফিরে যায় মূল মালিকের হাতে। একই ভাবে শহিদুল ইসলাম সম্পাদিত ও প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক নয়া আন্দোলন’ নামের একটি পত্রিকা বের হয়। ২০০৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর এখান থেকে জাহাঙ্গীর আলম চুক্তির মাধ্যমে এটি সম্পাদনা ও প্রকাশনা করেন। চুক্তির মেয়াদ শেষে ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্ববর ফিরে যায় পাবনায় মূল মালিকের কাছে। ২০০৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর চাটমোহরবাসী প্রথম বারের মতো একটি দৈনিক পত্রিকা হাতে পায়। ‘দৈনিক চলনবিল’ নামের পত্রিকাটির প্রকাশক ফাহিমা খন্দকার। সম্পাদক হিসাবে রয়েছেন তার ছোট ভাই সাংবাদিক রকিবুর রহমান টুকুন। ২০১০ সালের ৩ অক্টোবর আরেকটি সাপ্তাহিক প্রকাশিত হয়। সাপ্তাহিক ‘সবুজ আলো’ নামের কাগজটির সম্পাদক ও প্রকাশক সাংবাদিক সিদ্দিক আলম সবুজ। একই বছরের ২৯ আগষ্ট থেকে চাটমোহর থেকে প্রকাশনার(ডিক্লারেশন)নিয়ে পাবনা থেকে প্রকাশিত হচ্ছে “সাপ্তাহিক বাঁশপত্র”। আলহাজ্ব রাজিউর রহমান রুমী এটির প্রকাশক ও সম্পাদক। চাটমোহর উপজেলার একটি ইউনিয়ন হান্ডিয়াল। সেখান থেকে ২০১০ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে বের হচ্ছে ‘চলনবিলের আলো’ নামে একটি সাপ্তাহিক। সবশেষে ২০১৩ সালের ২৬ জানুয়ারী প্রকাশিত হলো ‘দৈনিক আমাদের বড়াল’ নামে আরো একটি দৈনিক পত্রিকা। সাংবাদিক হেলালুর রহমান জুয়েল পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রকাশক।

সাংবাদিকতায় সেকাল-একালঃ- সাংবাদিকতার মতো পেশায় একটা সময় ছিলো, যখন খুব একটা আসতো না কেউ মফস্বলের অচলায়তনে। নিছক সৌখিনতা অথবা এক ধরনের ভালোলাগা থেকে কেউ কেউ এসেছিলেন এ পেশায়। আবার পদচিহৃন রেখে ফিরেছেন ঠিকাদারীতে, শিক্ষকতায়, রাজনীতিতে ও চাকরীতে। কিন্তু এখন দিন বদলেছে। এ পেশায় এসেছে কিছুটা হলেও পেশাদারীত্ব। স্থানীয় ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে দৈনিক-সাপ্তাহিক পত্রিকা। আসছেন দলবেঁধে অনেকেই। সে সময়ে অর্থাৎ ১৯৭৮ সালের দিকে যদি আমার তাকাই, দেখি চাটমোহরে একজন ভাষা সৈনিক ও হাইস্কুলের শিক্ষক মরহুম আব্দুল হামিদকে সাংবাদিকতা পেশায়। তিনি রাজশাহী থেকে প্রাকশিত দৈনিক বার্তায় কাজ করছেন। পরে অবশ্য তিনি দৈনিক জনতায় যোগদেন। ১৯৭৯ তে এসে পাই এসএম হাবিবুর রহমানকে। তিনি তখন ‘দৈনিক কিষান’ পত্রিকায় কাজ করতেন। পরে নব-অভিযান ও বাংলার বানীতেও কাজ করেন। এখন তিনি চাটমোহর বার্তার সম্পাদক। মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষক আতাউর রহমান রানা ১৯৮৩ সালে সাপ্তাহিক পাবনা বার্তায় কাজ করতেন। আমরা আফজাল হোসেনকে দেখি সাপ্তাহিক নতুন বাংলায় কাজ করতে ১৯৮২ সালে। এ সময়ই মুক্তিযোদ্ধা এসএম মোজাহারুল হক ও অধ্যাপক আব্দুল মান্নান সরকার সাংাদিকতা করতেন। যদিও তারা ছিলেন অল্প দিন। সন্তোষ রায় চৌধুরীকে সাপ্তাহিক একতায় কাজ করতেন ৮৮ সালে। ১৯৮৭-৮৮ সালে গঠিত হয় চাটমোহর সাংস্কৃতিক পরিষদ নামের একটি সংগঠন। সেই সংগঠনের প্রায় সবাই শুরু করেন একটা সময় পর্যন্ত সাংবাদিকতা।

তারা হলেন-বিশিষ্ট নাট্যকার আসাদুজ্জামান দুলাল( রংপুরের দৈনিক দাবানল), সজল বিশ্বাস( নব-অভিযান, ঢাকা),রাজিউর রহমান রুমী(দৈনিক দক্ষিনাঞ্চল, এখন চ্যানেল ইটিভি ও মানজমিনে), মুসা খসরু(দৈনিক কল্যান, কুষ্টিয়া), মনোয়ার হোসেন চৌধুরী শাহীন(দৈনিক রানার, যশোহর), রঞ্জন ভট্রাচার্য(দৈনিক উত্তরাঞ্চল, বগুড়া), আব্দুল মান্নান পলাশ(পাবনার সাপ্তাহিক বিবৃতি দিয়ে শুরু করে এখন প্রথম আলোতে)।

আফতাব উদ্দিন(দৈনিক সংগ্রাম),হেলালুর রহমান জুয়েল(সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় শুরু করে আজকের কাগজ, জনকণ্ঠ হয়ে এখন ইত্তেফাক এ), রকিবুর রহমান টুকুন(দৈনিক সেনালী সংবাদ), ইশারত আলী(দৈনিক করতোয়,বগুড়া), আব্দুর রাজ্জাক জকি(দৈনিক ভোরের কাগজ. ঢাকা)সরদার মনসুর আলী(দৈনিক চাঁদনী বাজার, বগুড়া), সরদার আলী হায়দার(দৈনিক মানবজমিন), আশা পারভেজ(দৈনিক দৌলতপুর বার্তা, কুষ্টিয়া), এ্যাডঃ আব্দুল আজীজ(দৈনিক দিনকাল, ঢাকা), শামীম হাসান মিলন(দৈনিক আজকের কাগজ, পরে সমকাল), শরীফ মাহমুদ সঞ্জু(দৈনিক জনকণ্ঠ, আমারদেশ), এবাদত হোসেন(সোনালী সংবাদ, রাজশাহী), স্বপন কুমার কুন্ডু(দৈনিক উত্তরদেশ, ঈশ্বরদী), শফিকুল ইসলাম বাচ্চু(দৈনিক ইছামতি ও দৈনিক নয়াদিগন্ত), কেএম বেলাল হোসেন স্বপন(দৈনিক সংবাদ, ঢাকা), আফতাব উদ্দিন(দৈনিক ইনকিলাব, ঢাকা), এসএম বাবলু(দৈনিক সমাচার, ঢাকা), শাহিনুর রহমান শাহীন(দৈনিক আমার দেশ, ঢাকা), মহিদুল ইসলাম(দৈনিক,ভোরের ডাক, ঢাকা), বকুল রহমান(দৈনিক ভোরের কাগজ, ঢাকা), জাহাঙ্গীর আলম(দৈনিক অর্থনীতি, ঢাকা)জাহাঙ্গীর হোসেন(দৈনিক ডেসটিনি, ঢাকা), কিংসুক সাহা(দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ঢাকা)ইকবাল কবির রঞ্জু(সাপ্তাাহিক সবুজের আলো, চাটমোহর)আব্দুল লতিফ রঞ্জু(সাপ্তাহিক সময় অসময়, চাটমোহর), সোহেল মীর(০), ওমর ফারুক(০)।

সূত্রঃ রাধারমন সাহার ‘জিলা পাবনার ইতিহাস’, প্রমথনাথ বিশীর ‘ চলনবিলে ইতিহাস’, অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদের ‘চলনবিলের ইতিকথা’ ও ডিষ্ট্রিক গেজেটিয়ার পাবনা।

কৃতজ্ঞতাঃ বন্ধুজন, এসএম হাবিবুর রহমান, সম্পাদক সাপ্তাহিক চাটমোহর বার্তা।

লেখক পরিচিতি:আব্দুল মান্নান পলাশ

প্রতিনিধি দৈনিক প্রথম আলো, চাটমোহর, পাবনা