তথ্য ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা

Dr. Md. Aliur Rahman

তথ্য ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা

|| অলিউর রহমান ||

 

জানার স্বাধীনতা

পারিপার্শ্বিক জীবন ও জগৎ সম্পর্কে জানার স্বাধীনতা নিয়েই মানুষ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছে। জন্মগতভাবেই মানুষ চিন্তা-চেতনা ও বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগের অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছে। তাই বলা যায় প্রত্যেক মানুষ জন্মসূত্রেই তথ্যজগতে প্রবেশ করার অসীম যোগ্যতা অর্জন করে রেখেছে। জানার এই অসীম যোগ্যতা থাকলেও যুগে যুগে মানুষ জানতে গিয়ে এবং জানাতে গিয়ে নানা বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছে। চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা কখনো কখনো শাসকগোষ্ঠী অস্বীকার করার চেষ্টা করেছে। সত্য কথা বলার দায়ে বহু গুণী ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা কঠোর শাস্তিরও সম্মুখীন হয়েছেন; কিন্তু জানা ও জানানোর ইচ্ছা ও চেষ্টাকে কেউ কোনোদিন অবদমন করতে পারেনি। জানার স্বাধীনতা মানুষের এমন এক স্বাধীনতা যা দমন করা যায়ও না। তাইতো মুক্তভাবে জানার ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমরা ব্রিটিশ রাজের সঙ্গে বিশ্বখ্যাত ইংরেজ কবি মিল্টনকে লড়াই করতে দেখি। কবির ভাষায়: ‘‘দাও আমায়, জ্ঞানের স্বাধীনতা দাও, কথা কইবার স্বাধীনতা দাও, মুক্তভাবে বিতর্ক করার স্বাধীনতা দাও। সবার ওপরে আমাকে দাও মুক্তি।’’

কবি মিল্টন তার বিখ্যাত গ্রন্থ অ্যারিওপ্যাজিটিকায় আরও বলেছেন ‘‘মানুষের জানার স্বাধীনতা, বলার স্বাধীনতা, বিবেকের তাড়নায় স্বাধীনভাবে নিজের মতের পক্ষে যুক্তি প্রদানের স্বাধীনতা, অন্য যেকোনো স্বাধীনতার চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে।”

আমাদের অন্যতম জাতীয় নেতা মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ‘হক কথা’ পত্রিকাটি সরকার বন্ধ করে দিলে কবি মিল্টনের চেয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে মওলানা ভাসানী বলেন, ‘‘দেশের মঙ্গলের জন্য আমার চিন্তা -চেতনায়, বুদ্ধি-বিবেকে যা আসে তা এখন আমি ঘরে ঘরে, জনে জনে গিয়ে বলব, হক কথার কথাগুলোই বলে আসব…”।

গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নাগরিকদের জানা ও জানানোর স্বাধীনতা অত্যন্ত মূল্যবান একটি অর্জন। প্রকৃত গণতন্ত্রের মর্মবাণী হলো রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হলো জনগণ। আমাদের সংবিধানেও বলা হয়েছে সে কথা; অর্থাৎ, ‘জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস’। আর তাইতো ‘অব দ্য পিপল্, বাই দ্য পিপল্, ফর দ্য পিপল্’ বলতে যা বুঝায় সেরূপ গণতন্ত্রের ধারণাকেই আমরা লালন করেছি আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নবীজ হিসেবে। কিন্তু স্বাধীনতার চার দশক পার করে নিজেদের ভাগ্য ও দেশ গড়ার কাজে জনগণের চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাক্সক্ষা এবং মুক্তভাবে মতামত প্রকাশ ও উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে স্বত:স্ফূর্ত জনঅংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সে স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা কতটা পূরণ হয়েছে বাস্তবে? আমার মনে হয় Ñসে সম্পর্কে আত্মজিজ্ঞাসার সময় এসেছে নতুন করে।

তথ্য কি ও কেন ?

‘মানবীয় যোগাযোগের কেন্দ্রীয় উপাদান হলো তথ্য। তথ্য হলো গণযোগাযোগের প্রাণ বা মূল চালিকাশক্তি।  বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘তথ্য হচ্ছে ব্যক্তি, পরিবেশ, সমাজ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অবস্থা সম্পর্কে সাধরণ বার্তা, ধারণা, ঘটনা, মতামত, চিত্র, উপাত্ত, মন্তব্য, অনুভূতি, জ্ঞানের ধারা ইত্যাদি, যা কাজের কিংবা কাজ-সংক্রান্ত পদক্ষেপের গতিশীলতা বাড়ায় বা কাজকে এগিয়ে নেয়’। তবে, তথ্য অধিকার আইনের ভাষ্যমতে, “তথ্য” অর্থে  কোনো কর্তৃপক্ষের গঠন, কাঠামো ও দাপ্তরিক কর্মকান্ড সংক্রান্ত  যে  কোনো স্মারক, বই, নকশা, মানচিত্র, চুক্তি, তথ্য-উপাত্ত, লগ বই, আদেশ, বিজ্ঞপ্তি, দলিল, নমুনা, পত্র, প্রতিবেদন, হিসাব বিবরণী, প্রকল্প প্রস্তাব, আলোকচিত্র, অডিও, ভিডিও, অংকিতচিত্র, ফিল্ম, ইলেকট্রনিক প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতকৃত  যে  কোনো ইনস্ট্রুমেন্ট, যান্ত্রিকভাবে পাঠযোগ্য দলিলাদি এবং ভৌতিক গঠন ও বৈশিষ্ট্য নির্বিশেষে অন্য যে কোনো তথ্যবহ বস্তু বা  সেসবের প্রতিলিপিও এর অন্তর্ভুক্ত হবে।

 

তথ্য শব্দটির অর্থ হলো ‘বার্তা’,‘বৃত্তান্ত’, বা ‘খবর’। তথ্যের আর এক মানে হলো ‘সত্য’। আর সত্যকে তো লুকোনো যায়না। আপন শক্তিতে সত্য প্রকশিত হবেই। সত্য জানার অধিকার মানুষষের জন্মগত অধিকার। কোনো ঘটনা বা অবস্থার সত্য ধারণাই হলো তথ্য। কোনো ঘটনা, অবস্থা বা পরিস্থিতি সম্পর্কে মানুষের ব্যক্তিগত অনুশীলন বা অনুসন্ধানের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানই হলো তথ্য। সহজকথায় তথ্যই আসলে জ্ঞান। আর জ্ঞানের আর এক নাম তাই ক্ষমতা (Knowledge is power) । আর সেকারণেই তথ্যের স্বাধীনতা মানে নাগরিকের জানা ও জানানোর স্বাধীনতা। তথ্যের স্বাধীনতা বলতে একদিকে যেমন ব্যক্তি মানুষের বাক ও ভাব প্রকাশের স¦াধীনতাকে বোঝায়, একইসঙ্গে তথ্যের স্বাধীনতা বলতে বুঝায় তথ্যমাধ্যম তথা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা (Freedom of the Press)।

 

সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা

একটি মুক্ত ও সভ্য সমাজে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। তাত্ত্বিকভাবে রাষ্ট্রের আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের পরেই চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে সংবাদমাধ্যম তথা গণমাধ্যমের স্থান নির্ধারিত হলেও এই ‘চতুর্থ স্তম্ভ (Fourth Estate)  ব্যতিরেকে বর্তমান যুগে অন্য তিনটি স্তম্ভকে সক্রিয় বা কার্যকর করার প্রয়াস একটি অকল্পনীয় এবং অসম্ভব ব্যাপার। রাষ্ট্রীয় জীবনে সংবাদমাধ্যমের এই অসীম গুরুত্ব ও অপরিসীম ভূমিকার কারণেই প্রেসিডেন্ট জেফারসন বলেছিলেন, ‘‘যদি আমাকে বলা হয় কোনটা বেছে নেব সংবাদক্ষেত্র (Press) ছাড়া সরকার, না সরকার ছাড়া সংবাদক্ষেত্র? আমি বেছে নেব শেষেরটিকে।”

আজ থেকে দু‘শ আটত্রিশ বছর আগে (১৭৬৯ সালে) William Blackstone সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “Every freeman has an undoubted right to lay what sentiment he pleases before the public; to forbid this, is to destroy the freedom of the press.”

জাতীয় জীবনে স্বাধীন সংবাদক্ষেত্রের অপরিসীম গুরুত্ব ও ভূমিকার কথা ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহেরু উপলব্ধি করেছেন এভাবে: “I would rather have a completely free press with all the dangers involved in the wrong use of the freedom than a suppressed or a regulated press.”

স্বাধীন সংবাদক্ষেত্র হচ্ছে ‘গণতন্ত্রের শীর্ষ স্বাক্ষর’ যাকে প্রখ্যাত সাংবাদিক মরহুম ওবায়েদ-উল-হক বলেছেন ‘গণতান্ত্রিক অধিকারের সনদপত্র’। ওবায়েদ-উল-হক এর মতে, ‘‘গণতন্ত্র স্বাধীনতা সংবাদপত্র (সংবাদক্ষেত্র) এই তিনটি শব্দ এক নি:শ্বাসে উচ্চারণ করতে হয়। ভিন্ন ভিন্ন হলেও এদের মর্মার্থ অভিন্ন একই সত্যের তিন রূপ বা একটি ত্রিমাত্রিক সত্য। ব্যক্তি স্বাধীনতা তথা চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রকৃষ্ট প্রকাশ মাধ্যম হচ্ছে সংবাদপত্র (Press)। কেবল গণতান্ত্রিক পরিবেশেই ঐ দুয়ের উদ্ভব ও স্থিতি। গণতন্ত্র নেই তো ব্যক্তি স্বাধীনতা নেই, সংবাদপত্রও নেই। বস্তুত সংবাদপত্র গণতান্ত্রিক অধিকারের সনদপত্র।’’

মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার। আর ব্যক্তি নাগরিকের চিন্তা-চেতনাকে সংবাদমাধ্যম তথা গণমাধ্যমে প্রকাশও সেই মৌলিক অধিকারের আরেকটি স্বরূপ। জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় বলা হয়েছে: ‘প্রত্যেকের নিজস্ব মত ধারণ এবং তা প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। বাধাহীনভাবে যেকোনো মত গ্রহণ এই অধিকারের অন্তর্ভুক্ত’। কিন্তু আমাদের সংবিধানে যদিও মৌলিক অধিকারের মধ্যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা আছে, তারপরও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃংখলা, শালীনতা, মানহানি বা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা নিষেধ রয়েছে। বাক্ স্বাধীনতা বলতে এখানে বুঝানো হয়েছে শব্দের মাধ্যমে ধারণার প্রকাশ, বলা, লেখা বা ছাপানো বা রেডিও, টেলিভিশন বা অন্য কোনো মাধ্যমে প্রকাশ।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে:

৩৯ (১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হলো

(২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনের প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষেÑ

(ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং

(খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হলো।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে এভাবে: “A free press means a press which is free from the compulsions from whatever sources governmental, social, external or internal. A free press is for the expression of opinion in all its phases. Freedom of press includes the right to adopt and pursue a policy without governmental restriction.”

ভারতের প্রথম Press Commission  সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছে: “…as the freedom to hold opinions, to receive and to impart information through the printed word, without any interference from any public authority.”

বাংলাদেশের প্রেস কমিশনের রিপোর্টে (১৯৮৪) উল্লেখ করা হয়েছে:“ মত প্রকাশের স্বাধীনতা হচ্ছে মানুষের অবিচ্ছেদ্য অধিকার। মত প্রকাশের স্বাধীনতার ধারণাটি বাক স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। যে নীতিমালার ওপর মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ধারণাটির উদ্ভব হয়েছে তা সবই এক।”

ফ্রিডম অব দ্য প্রেস’ – এর ধারণাকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস ব্যাখ্যা করছেন এভাবে: “এটা কেবল সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নয়, নয় কেবল সাংবাদিকের তথ্যপ্রাপ্তির স্বাধীনতা, বড় অর্থে এটা আসলে সমাজের স্বাধীনতা, সমাজস্থ মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির স্বাধীনতা। সাংবাদিক যা করেন তা হলো সমাজের এই স্বাধীনতাকে তার মাধ্যমে চর্চা করেন। সংবাদমাধ্যম ছাড়াও যে-কেউ এর চর্চা করতে পারেন। কারণ ভাব বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের স্বাভাবিক অধিকার। একজন কৃষকের উন্নত বীজ বা সারের তথ্য জানার অধিকার, নির্যাতিত নারীর আইনী সহায়তার তথ্য পাওয়ার অধিকারও  এ অর্থে ফ্রিডম অব দ্য প্রেসের আওতায় পড়ে।

উপর্যুক্ত অলোকপাতে আশা করি স্বাধীন সংবাদক্ষেত্রের স্বরূপ, প্রকৃতি এবং নাগরিক জীবনে সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব ও ভূমিকা অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু সংবাদক্ষেত্রের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক কিরূপ হওয়া উচিত এবং দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে সে সম্পর্ক কিরূপ পর্যায়ে রয়েছে আমার মনে হয় সে সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত না করলেই নয়।

একটি মুক্ত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে রাষ্ট্রের জন্য একটি স্বাধীন গণমাধ্যম পরিবেশ একান্ত অপরিহার্য হলেও একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় লক্ষ করা যায় সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের লোকজনদের কাছে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম একটি সার্বক্ষণিক বিরক্তির উৎস হিসেবে পরিগণিত হয়। তবে একটি জনবান্ধব সরকার এই উৎস থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারে। অধ্যাপক লাস্কি সম্ভবত সে কথাটিই বুঝাতে গিয়ে বলেছেন, “সরকার তার মিত্রদের স্তুতির থেকে শত্র“র সমালোচনায় বেশি শিখতে পারে।”

উন্নয়ন যোগাযোবিদ ড্যানিয়েল লার্নারের মতে, জাতীয় উন্নয়ন প্রচেষ্টায় সরকারই প্রধান দিক নির্দেশক শক্তি এবং এর দ্বারা আনিবার্যভাবেই গণমাধ্যমে সরকারের অন্তর্ভুক্তি বোঝায়। তাই গণমাধ্যমে সরকার কী ধরনের নিয়ন্ত্রণ চর্চা করছে এবং তথ্যের অবাধ আদান-প্রদানে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন সে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, যে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের কথা আজকে সবাই খুব জোর দিয়ে বলছে তার মূল কথাই হচ্ছে ব্যক্তিবর্গ এবং প্রতিষ্ঠানকে সরকার থেকে আলাদা বিবেচনা করা যাবে না, তা সেই ব্যক্তিবর্গ বা প্রতিষ্ঠান সরকারের সমালোচনায় যত মুখরই হোক না কেন।

তবে একথাও ঠিক যে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানে অনুমোদিত স্বেচ্ছাচারিতা নয়। স্বাধীনতার অন্তর্নিহিত অর্থ হলো দায়িত্বশীলতার প্রশ্নে সংবাদমাধ্যমগুলোর রয়েছে ‘অডিয়েন্স’, সমাজ তথা দেশের প্রতি একটি সুবিশাল দায়বদ্ধতা। আর এই দায়বদ্ধতার একটি বড় দিক হলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সমূহসংবাদ ও অভিমত হতে হবে বিশ্বাসযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ। তাছাড়া, সংবাদ, সংবাদভাষ্য কিংবা অভিমত যা-ই প্রকাশিত হোক না কেন তা হওয়া উচিত সাংবাদিকতার সার্বজনীন নীতিমালা অনুসারী এবং জাতীয় স্বার্থের অনুকূল।

গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম:আন্তঃসম্পর্কের স্বরূপ

প্রতিনিয়ত আমরা গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলছি। কিন্তু ঠিক কোন মোড়কের গণতন্ত্রের পক্ষে আমাদের অবস্থান আমার মনে হয় সে প্রসঙ্গে প্রথমেই স্পষ্ট করে নেয়া ভালো। আর এ বিষয়ে নোয়াম চমস্কি’র গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম বিষয়ক এক বক্তব্যের অংশবিশেষ এক্ষেত্রে যথেষ্ঠ প্রাসঙ্গিক হবে:

“সমকালীন রাজনীতিতে গণমাধ্যম বা প্রচারমাধ্যমের ভূমিকা এই প্রশ্ন করতে আমাদের বাধ্য করে যে ঠিক কী জাতীয় বিশ্বে ও কোন ধরনের সমাজে আমরা বাস করতে চাই? বিশেষ করে, গণতন্ত্রের ঠিক কোন অর্থে আমরা চাই যে এ সমাজ গণতান্ত্রিক হয়ে উঠুক। … গণতন্ত্রের একটি ধারণায় দেখা যায় যে গণতান্ত্রিক সমাজ মানে এমন এক সমাজ, যেখানে নিজেদের যাবতীয় বিষয়-আশয়ের ব্যবস্থাপনায় অর্থপূর্ণভাবে অংশ নেওয়ার উপায় সাধারণ মানুষের আছে। পাশাপাশি সেখানে সংবাদ কিংবা তথ্যের মাধ্যম খোলামেলা ও স্বাধীন। …গণতন্ত্রের বিকল্প এক ধারণায় দেখছি যে, নিজেদের নানাবিধ বিষয়-আশয়ের ব্যবস্থাপনা থেকে সাধারণ মানুষকে অবশ্যই সরিয়ে রাখতে হবে এবং সংবাদ মাধ্যমকে অবশ্যই কঠোর ও সংকীর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। গণতন্ত্রের এ ধারণা শুনে একটু অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু এটাই যে প্রচলিত ধারণা…। বাস্তবে বহুদিন ধরে এ ধারণা শুধু প্রয়োগে নয়, রয়েছে তত্ত্বেও। এর দীর্ঘ ইতিহাস শুরু হয়েছে সেই সতেরো শতকে ইংল্যান্ডে প্রথম আধুনিক গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সময় থেকে, যেখানে এই দৃষ্টিকোণই বহুলাংশে প্রকাশিত।”

সঙ্গতকারণে আমরা যদি প্রথমোক্ত ধরনের গণতন্ত্রের পক্ষে আমাদের অবস্থান নিশ্চিত করি, তাহলে একথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে, স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের ব্যবস্থাই হলো গণতন্ত্র প্রকাশ ও বিকাশের মূল ভিত্তি। তাই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অর্থই হলো জনগণের ভালো-মন্দের সবকিছুই তাদের জানার সুযোগ দিতে হবে এবং গণমাধ্যমে জনমত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। আর এই ব্যবস্থা  সুনিশ্চিত হলে তখনই কেবল নাগরিক জীবনে অর্থবহ গণতন্ত্র ,সুশাসন ও মানবাধিকারের ধারণা বিকশিত হতে পারে। কেননা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যা-ই বলি না কেন এর অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এবং একইসঙ্গে সেখানকার গণমাধ্যমেরও গণতন্ত্রায়ন পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকা। আর একমাত্র পুরোপুরি গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায়ই গণমাধ্যমের গণতন্ত্রায়ন এবং সে সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুরোপুরি আশা করা যায়।

গণমাধ্যমসমূহ গণমানুষের কথা বলবে, গণমানুষের অর্থে ও স্বার্থে পরিচালিত হবে এটাই স্বাভাবিক। সে কারণেই এর নাম গণমাধ্যম। অর্থবহ গণতন্ত্রে জনগণই যে সকল ক্ষমতার উৎস আমাদের সেকথা ভুললে চলবেনা। তাই গণতন্ত্রের সংজ্ঞায় যেরূপ “…of the people, by the people, for the people” কথাটি প্রযোজ্য, অনুরূপভাবে গণতন্ত্রহীন পরিবেশে গণমাধ্যম অর্থহীন, গণমাধ্যমের স্বচ্ছন্দ বিকাশ অকল্পনীয়; আবার গণমাধ্যমের কাক্সিক্ষত ভূমিকা ও স্বচ্ছন্দ বিকাশ ছাড়া গণতন্ত্রও অর্থহীন, অবাস্তব। সে কারণে বলা যায়, গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম পরস্পর হাত ধরাধরি করে বিকাশ লাভ করে।

 

 

শেষ অথবা শুরুর কথা

গণমানুষের অবাধে তথ্যে অংশীদার হওয়া এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এক এবং অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কেরই ভিন্ন ভিন্ন রূপ। তথ্যের অধিকার কিংবা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা তাই কোনো শ্রেণীবিশেষের অধিকার নয় Ñএ অধিকার গণমানুষের অধিকার। এ অধিকার বিশ্বমানবতার অধিকার। এ অধিকার এমন এক আদায়যোগ্য অধিকার যার অর্জনে মানুষকে ক্রমাগত সচেতন ও তৎপর হতে হবে এবং তা লঙ্ঘিত বা বিঘিœত হলে তার প্রতিবাদেও নাগরিকদের সোচ্চার হতে হবে।

আবারও নোয়াম চমস্কি’র একটি উক্তির অবতারণা করে নিবন্ধটি শেষ করব : “আমরা কি কোন মুক্ত সমাজে বাস করতে চাই, না কি চাই এক ধরনের স্ব-আরোপিত একচ্ছত্র শাসনের বশীভূত হয়ে থাকতে, যেখানে বিহ্বল পশুদলের অবস্থান সমাজের প্রান্তে, তাদের লক্ষ্য বিপথে চালিত, আতঙ্কিত তারা, জাতীয়তাবাদী শ্লোগানে উচ্চকিত, প্রাণভয়ে ভীত, গভীর সম্ভ্রমে তাদের নেতার প্রতি অবনত, যে নাকি ধ্বংসের হাত থেকে তাদের রক্ষা করবে। আর ওদিকে শিক্ষিত লোকেরা সেখানে নির্দেশমতো কুচকাওয়াজে ব্যস্ত, যে-সমস্ত স্লোগান তাদের বারংবার আবৃত্তি করার কথা তার উচ্চারণে অকুণ্ঠ। আর এভাবে সমাজ-সংসারের হাল সেখানে যা দাঁড়াবে, তা কহতব্য নয়। শেষ পর্যন্ত তা হলে বলপ্রয়োগকারী এক ভাড়াটে রাষ্ট্রে আমরা পরিণত হব এবং আশা করব যে অন্যেরা গোটা দুনিয়াকে ধ্বংস করার জন্য তখন আমাদের নজরানা দেবে।”

 

সহায়ক তথ্যসূত্র:

১.             ড.মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ার, তথ্য প্রাপ্তির অধিকার ও সীমাবদ্ধতা, বিজেআর, বিসিডিজেসি, ভলিউম-১,সংখ্যা-২, ডিসেম্বর ১৯৯৬

২.             অলিউর রহমান, (২০০২),বাংলাদেশের সম্প্রচার মাধ্যম: একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ, গণমাধ্যম ও জনসমাজ, নাসরীন, গীতি আরা ও অন্যান্য (সম্পাদিত) শ্রাবণ, ঢাকা

 

৩.            মো: খুরশিদ আলম, (১৯৯২), সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সুবর্ণ, ঢাকা

৪.             সুধাংশু শেখর রায়, (১৯৯৪), সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতা : সাংবাদিক ও সংবাদপত্র, ধলেশ্বরী প্রকাশনী, ঢাকা

৫.             রোবায়েত ফেরদৌস (২০০৭), মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও জনমানুষের তথ্য অধিকার, তথ্যের অধিকার, ভবেশ দাশ ও রোবায়েত ফরদৌস (সম্পাদিত), চারদিক, ঢাকা

৬.            নোয়াম চমস্কি (২০০৬), মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, প্রচারের চমকপ্রদ সাফল্য, গণমাধ্যমের চরিত্র, মনফকিরা, কলকাতা

৭.             মো.জাহিদ হাসান, তথ্য অধিকার ও যোগাযোগের স্বাধীনতা, তথ্যের অধিকার, ভবেশ দাশ ও রোবায়েত ফেরদৌস (সম্পাদিত), চারদিক, ঢাকা

8. Toby Mendel, International Standards and Trends, Freedom of Information, A Comparative Legal Survey, UNESCO, UNESCO House New Delhi