………….

দেশ উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষার

ভবিষ্যত সম্প্রসারণ

প্রকৌশলী মো: সাহাবুদ্দীন সৈকত

প্রযুক্তিবিদ্যা বা কারিগরি নামক বাংলা পরিভাষাটি এসেছে ইঞ্জিনিয়ারিং নামক ইংরেজী শব্দ থেকে। আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর আগে ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে বিশ্বময় প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ে। প্রযুক্তি বা কারিগরি বিদ্যা বিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত। বিজ্ঞান চর্চায় যা কিছু উদ্ভাবিত হয়, তা বাস্তবায়নে প্রযুক্তির ব্যবহার হয়। প্রযুক্তিবিদ্যার যে কোন বিষয় বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে তার মূলে কোন না কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব রয়েছে। কারিগরি বিদ্যাকে সে কারণেই এপ্লায়েড সায়েন্স বলা হয়ে থাকে। বিজ্ঞানের তাৎপর্য কারিগরি বিদ্যার মাধ্যমে সাধারণের কল্যানে ব্যবহারের সুযোগ পায়।

কারিগরি বা প্রযুক্তিবিদ্যা দ্রুত পরিবর্তনশীল। বিজ্ঞানের তাত্ত্বিকজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে প্রযুক্তিরও অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। যে কারণে প্রযুক্তি হয়ে পড়েছে বিজ্ঞানের উপর নির্ভরশীল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক ও পরিপূরকতার ফলে সভ্যতার অগ্রগতি ঘটেছে। উন্নততর প্রযুক্তি আনুষঙ্গিক সম্পদ সৃষ্টিতে সহায়ক হয়েছে। এর ফলে প্রযুক্তির সঙ্গে উৎপাদনেরও এক নিবিড় যোগসূত্র তৈরী হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎপাদনের গুণগত ও পরিমাণগত রূপান্তর লাভ করেছে।

নতুন শক্তির উৎস, নতুন বস্তুর উদ্ভাবন, নতুন যন্ত্র নির্মাণ সবকিছুই মানুষের বস্তুগত চাহিদাকে কেন্দ্র করে বিবর্তিত হয়ে আসছে।

প্রথম শিল্প বিপ্লব তৈরী করেছিল বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও তাঁত শিল্পের যন্ত্রপাতি। ১৮ শতকে পেট্রল ও ডিজেল ইঞ্জিন, মোটর যান প্রভৃতি তৈরী করা হয়। পরবর্তীতে তড়িৎ চুম্বক শক্তি, বিদ্যুৎ, নিউক্লিয় শক্তি, ধাতব বস্তু, অর্ধপরিবাহী বস্তু, অতি পরিবাহী বস্তু, নানা শংকর ধাতু, চৌম্বক বস্তু, ট্রানজিস্টর রেডিও, আলোকতত্ত্ব কাঁচ, কোয়ান্টাম তত্ত্ব এসব কিছুর সমন্বয়ে দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হয়।

আধুনিককালে প্রযুক্তিকে উন্নয়নের কাজে লাগানো হচ্ছে। উৎপাদনের উপাদান বাড়ানোর সাথে প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। কলকারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি, শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি বা বিনিয়োগ বাড়িয়ে সম্পদ বাড়ানো প্রতিযোগিতার ফলে প্রযুক্তিরও অগ্রগতি ত্বরান্বিত হয়েছে।

আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তির উন্নতির ফলে টেলিফোন, টেলিপ্রিন্টার, টেলিভিশন প্রভৃতির সৃষ্টির ফলে তথ্য প্রযুক্তির বিকাশ লাভ করেছে। এর পরের ধাপে কম্পিউটার তৈরি ও তা ব্যবহারের ফলে তথ্য প্রযুক্তির সর্বোচ্চ বিকাশ লাভ ঘটে। কম্পিউটারের নানা মাত্রিক ব্যবহার তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক নতুন বিপ্লব এনেছে। মোবাইল, ল্যাপটপ, আইফোন, ইন্টারনেট, ই-মেইল প্রভৃতির উদ্ভাবন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রকে আমূল পাল্টে দিয়েছে।

বাংলাদেশে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের দশকে প্রথম কারিগরি শিক্ষার প্রচলন ঘটে। সে সময় সারাদেশের মধ্যে একমাত্র রাজধানী ঢাকায় মধ্যম শ্রেণীর প্রকৌশলী তৈরির জন্য ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স চালু করা হয়। তৎকালীন ডিগ্রি ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের জন্য আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে বুয়েট) প্রতিষ্ঠিত হয়। আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ডিগ্রি ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের সাথে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ৪ বছরের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের প্রচলন ছিল। পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে ঢাকা পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট চালু হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ এর অভ্যুদয় ঘটলে পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট এর প্রতিষ্ঠা সারাদেশে বিস্তার লাভ করে। বর্তমানে সারাদেশে সরকারি ও বেসরকারী পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট মিলে এ ধরনের প্রায় দুইশত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

মধ্যম শ্রেণীর প্রকৌশলী সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশে পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটসমূহ যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে মানবসম্পদের উন্নয়ন ছাড়া কোন বিকল্প নেই। পৃথিবীর উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কারিগরি শিক্ষার প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

কারিগরি শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে তারা দ্রুত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলেছে। কারণ কারিগরি শিক্ষার সাহায্যে স্বল্প সময়ে বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করা সম্ভব। নানা ধরনের সমীক্ষায় দেখা যায় যে, যে দেশে কারিগরি শিক্ষার হার যত বেশি সে দেশের মাথাপিছু আয় তত বেশি।

যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো দেশে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত অধিক সংখ্যক দক্ষ জনশক্তি থাকার ফলে তথাকার মানুষের বাৎসরিক মাথাপিছু আয় ৮ থেকে ৪৫ হাজার মার্কিন ডলারেরও বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশে ৭-৮ শতাংশের কিছু বেশি দক্ষ জনসম্পদ রয়েছে, আর তাতে আমাদের মাথাপিছু আয় মাত্র ৬০০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি।

এ তথ্য অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের সকল উন্নয়ন কর্মকান্ডে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা সবচেয়ে বেশি জড়িত। উৎপাদন ও সেবামূলক কর্মকান্ডেও তাদের অংশগ্রহণ রয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম খাত বিদেশ থেকে আসা রেমিটেন্স। বিদেশে কর্মরত দক্ষ জনশক্তির সিংহভাগই ডিপ্লোমা ও ডিগ্রি প্রকৌশলী। এদেশের ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা সুনাম ও দক্ষতার সাথে মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কর্মরত। এছাড়াও যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এ দেশের ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা চাকরি করে দেশের জন্য বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করছেন।

বিদেশে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর মতো দক্ষ জনসম্পদ আরো বেশী পাঠানো সম্ভব হলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হারও বৃদ্ধি পেত। দেশের আর্থসামাজিক সমৃদ্ধি বাড়াতে হলে কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ ছাড়া বিকল্প নেই।

দক্ষ মানব সম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশে TVET এর বর্তমান অবস্থার আরও সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন দরকার। এ ছাড়াও ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের শিল্পকারখানা ও সেবামূলক কাজে যে পরিমাণ চাহিদা রয়েছে তদনুযায়ী শ্রম সরবরাহের ব্যবস্থা থাকা দরকার। বাংলাদেশে ঞঠঊঞ শিক্ষার সম্প্রসারণ অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও মাদ্রাসা শিক্ষা যে হারে দ্রুত প্রসারণ লাভ ঘটছে, কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে তা হয়নি। বর্তমানে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থায় কারিগরি শিক্ষার অধীনে শিক্ষা গ্রহণরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭ শতাংশ মাত্র, অথচ জাপানে এ ধরনের শিক্ষায় শিক্ষিত জনবল ৬০ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪০ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৪২ শতাংশ।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পটভূমিতে কারিগরি শিক্ষা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এর আশানুরূপ বিকাশ ঘটেনি দেশের পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটগুলোর। ফলে দক্ষ মানব সম্পদ উন্নয়নের উজ্জ্বল সম্ভাবনার ক্ষেত্রটি নানা কারণে অবহেলিতই রয়ে গেছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে উন্নয়ন কর্মকান্ড। দক্ষ জনশক্তির অভাবে উৎপাদন ও সেবামূলক উন্নয়ন কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। বিদেশে অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে আশানুরূপ অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে না। অথচ দেশকে সমৃদ্ধ করতে হলে শ্রমপোযোগী দক্ষ জনশক্তি বিশেষ প্রয়োজন। কাজেই কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণের মাধ্যমে মধ্যম স্তরের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের দেশের উন্নয়নের ধারায় বেশি করে যুক্ত করা হলে তা দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সহায়ক হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতি এর ফলে ত্বরান্বিত হবে।

 

লেখক পরিচিতি: প্রকৌশলী মো: সাহাবুদ্দীন সৈকত

প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, বিআইআইটি (BIIT)