নির্ভুল তথ্য জানানো সাংবাদিকের

নৈতিক কর্তব্য

 

— রায়হান আহম্মেদ রানা 

অবাধ তথ্য প্রযুক্তি গনমাধ্যমের বিকাশ ত্বরান্বিত করেছে। সেই সঙ্গে গনমাধ্যমের শাখা প্রশাখার বিস-ার মানুষের জীবনে ঘটিয়েছে অবাধ তথ্য পাওয়ার অধিকার। বর্তমান বিশ্বে গনমাধ্যমের একটা বড় অংশ প্রতিনিধিত্ব করছে সংবাদপত্র। টেলিভিশন, ইন্টারনেট, ফেসবুক, গুগল, ইউটিউবের মত প্রযুক্তিগুলো বর্তমানে মানুষের বেডরুম থেকে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজের অংশ হিসাবে পরিনত হয়েছে। প্রযুক্তির কল্যানে বিশ্ব এক দিকে যেমন পেয়েছে অবাধ তথ্য প্রযুক্তির বিভিন্ন মাধ্যম তেমনি এর উপকারিতা ও অপকারিতার প্রভাবও সমাজে ব্যাপক। সমাজ বদলের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এখন এ সব গনমাধ্যম।

সংবাদপত্রকে বলা হয় জনগনের কন্ঠস্বর। একটি দেশের গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় স্বাধীন সংবাদপত্রের অবদান অনেক। জনমতের ধারক ও বাহক হিসাবে গনতান্ত্রিক সরকার ব্যবস’াকে সক্রিয় রাখতে চালিকা শক্তি হিসাবে কাজ করে সে দেশের সংবাদপত্র। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অধিকার সংবিধানে সংরক্ষিত থাকলেও সে অধিকারের অপব্যবহার করে ঢালাও মত প্রকাশ ও মন-ব্য করার অধিকারী কেউ নয়। সংবাদপত্রে যিনি কাজ করেন তার যেমন লেখার অধিকার রয়েছে, দেশের নাগরিকদেরও সেই অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে প্রতিটি নাগরিকের ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার দেয়া হয়েছে। দেশের যে কোন নাগরিক যেমন আইনের আওতায় পড়ে তেমনি সংবাদপত্র ও সাংবাদিকরাও আইনের গন্ডির বাহিরে নয়। ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত বক্তব্য ও ছবির একটা বিশেষ ধরনের মর্যাদা রয়েছে।

সমাজে বসবাস করা একজন মানুষ বরাবরই নাম যশ ও সুনামের কাঙ্গাল হয়ে থাকেন। দায়িত্বশীল সংবাদপত্র মানুষের সুনামকে অক্ষুন্ন রাখে। প্রভাবিত হয়ে প্রশংসা বা নিন্দা করে না। তবে কোন ব্যক্তি বা অক্ষরে ছাপা কোনো প্রকাশনার দ্বারা সুনাম ক্ষুন্ন হলে ক্ষতিপূরণ দাবি করা যায়। যুগ-যুগান-র ধরে মানুষ তার সুনামকে সুরক্ষা দিয়েছে। মানুষ নামের জন্য কতখানি কাঙাল তার গভীরতা বোঝা যায় সেক্সপিয়ারের “ওথেলো” নাটকে নায়ক তার এক বক্তব্যে বলেছেন “সে তার সুনাম কেড়ে নিয়েছে, কেড়ে নেয়া সেই সুনাম তাকে সমৃদ্ধ করেনি কিন’ আমাকে নিঃস্ব বানিয়ে ছেড়েছে।”

লিখিত কোন প্রকাশনী অথবা বক্তব্যের প্রেক্ষিতে যদি আরেক জনের মর্যাদা, শ্রদ্ধা, সুনাম ও আস’া খর্ব হয় তবে তাকে মানহানি বলা হয়। সংবাদপত্র স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারী হলেও মানহানী সংক্রান- আইনের অধীন। পত্রিকায় প্রকাশিত গল্প, শিরোনাম, সম্পাদকীয়, কার্টুন, বিজ্ঞাপনের দ্বারা মানহানি হতে পারে। এমনকি বেতার বা টেলিভিশনের মাধ্যমেও অনুরুপভাবে মানহানি হতে পারে। লিখিত ও অলিখিত দু’ভাবে মানহানি হয়। মানহানির কারনে দেশে প্রচলিত আইনের অধীন দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের বিধানমত মামলা হতে পারে। এসব মামলায় সাংবাদিক, প্রকাশক ও সম্পাদক দোষী প্রমানিত হতে পারেন। কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মর্যাদাহানিকর ঘটনায় দেওয়ানী মামলা দায়ের হতে পারে। এক্ষেত্রে বিচারক প্রমান সাপেক্ষে আর্থিক জরিমানা, দন্ড দিতে পারেন। অপরদিকে রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক কোন কাজ, ধর্মীয় গোষ্ঠীর ধর্মানুভূতিতে আঘাত, কোন বিশাল জনগোষ্ঠীর মূল্যবোধ ও বিশ্বাসে আঘাত হানে এমন কিছু হলে তাও ফৌজদারি আইনে বিচার হতে পারে। এমন মামলায় দোষী প্রমানীত হলে অর্থদন্ড ছাড়া কারাদন্ডও হতে পারে। আইন তার নিজ গতিতে চলবে এটাই স্বাভাবিক কিন’ তাই বলে কি সাংবাদিক হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন? না; একজন সাংবাদিকের বেলায় তা হয়নি কোনদিন, এবং তা হবেও না। সাংবাদিকের লক্ষ্য রাখা উচিত তথ্য প্রমান সাপেক্ষে সংবাদ পরিবেশন করার দিকে। সৎ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার স্বার্থে প্রতিটি সংবাদপত্র ও সংবাদক্ষেত্রের প্রতিটি সাংবাদিকের উচিত মানহানি হয় এমন উপকরন বাদ দিয়ে সংবাদ উপস’াপন করা।

একটি ভালো সংবাদ তৈরীর জন্য একজন সাংবাদিককে ছুটতে হয় তথ্য অনুসন্ধানের পিছনে। নির্ভূল তথ্য ও শব্দের গাথুনী সংবাদ উপস’াপনের ভীত মজবুত করে। সহজ কথা যেমন সহজ ভাবে বলা সহজ হয় না, তেমনি সহজ-সরল সংবাদ তৈরীতেও সহজে তথ্য সংগ্রহ করা যায় না। সংবাদ তৈরী করতে গিয়ে একজন সংবাদ কর্মীকে বিভিন্ন পন’া অবলম্বন করতে হয়। তথ্য সংগ্রহের প্রতিবন্ধকতার দরুন একজন সংবাদ কর্মী কর্তৃক অনেক সময় ভালো সংবাদ তৈরীর উপযোগিতা থাকলেও তা করতে পারেন না। বাংলাদেশে সমপ্রতি যে তথ্য অধিকার আইন পাশ হয়েছে তা সাংবাদিক ও সংবাদ কর্মীদের জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(ক) অনুচ্ছেদ অনুসারে “রাষ্টের সকল ক্ষমতার মালিক জনগন” এটা নিশ্চিত করা হয়েছে। সুতরাং সরকারের কাছে থাকা তথ্য জানার অধিকারও জনগনের রয়েছে। রাষ্ট্রের মালিক জনগন হলে, রাষ্ট্রের সরকারের কাছে থাকা তথ্যের মালিকও জনগন। এ ধারনা থেকেই তথ্য অধিকার আইনের সৃষ্টি। সাংবাদিকরা সমাজের বিভিন্ন সমস্যা, দুর্নীতি ও সমাজের সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন। পেশার তাগিদেই সামাজিক দায়বদ্ধতায় জড়িয়ে পড়েন সাংবাদিকরা। নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয় পেশার তাগিদেই। তথ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের বিভিন্ন ধরনের কৌশল অবলম্বন করতে হয়। তবে সর্ব ক্ষেত্রে তথ্য প্রাপ্তির বিষয়টি সহজ, সরল হয় না। তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে জনগন সরকার, সরকারি ও বিদেশী সাহায্যপৃষ্ঠ বেসরকারী সংস’া বা এনজিওর কাছ থেকে তাদের পরিচালিত কর্মকান্ড বা লেনদেন সংক্রান- যে কোন তথ্য চাইতে পারবে।

তথ্য অধিকার আইনে জনগরুত্বপূর্ণ তথ্য জনগনের জানার অধিকারের মধ্যে আনা হয়েছে। এই আইনের অধীনে সরকার ও বেসরকারী সংস’া তথ্য দিতে বাধ্য। তথ্য অধিকার আইনে তথ্য বলতে বুঝানো হয়েছে, “যে কোন সরকারি এবং বেসরকারী ও বিদেশী সাহায্যেপুষ্ঠ বেসরকারী সংস’ার গঠন, কাঠামো ও দাপ্তরিক কর্মকান্ড সংক্রান- যে কোন স্মারক, বুক ,নকশা, মানচিত্র, চুক্তি, তথ্য-উপাত্ত, লগবই, আদেশ বিজ্ঞপ্তি, দলিল, নমুনা, পত্র, প্রতিবেদন, হিসাব বিবরণী, প্রকল্প, প্রস-াব, আলোকচিত্র, অডিও, ভিডিও, আঁকা ছবি, ফ্লিল্ম, ইলেকট্রনিক প্রক্রিয়ায় প্রস’তকৃত যে কোন ইনস্ট্রমেন্ট, যান্ত্রিকভাবে পাঠযোগ্য দলিল পত্র সংক্রান- যাবতীয় সব কিছু।” তবে লক্ষনীয় যে দাপ্তরিক  নোটশিট বা নোট শিটের প্রতিলিপি তথ্য সংক্রানে-র অনর্-ভূক্ত নয়।

 তথ্য প্রদানকারী সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তথ্য আইন অনুযায়ী তথ্য দিতে হবে। প্রতিটি কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান কাজ হচ্ছে সহজে এবং কম দামে সম্ভব হলে বিনা মূল্যে গ্রহীতাকে তথ্য দেয়া। তথ্য চাহিদাকারী ব্যক্তি এই আইন অনুযায়ী অনুরোধকৃত তথ্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে না পেলে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করতে পারবেন। যেসব প্রতিষ্ঠান তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পড়ে না বা তথ্য দিতে বাধ্য নয় সেগুলো হলোঃ- জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস’া (এনএসআই), ডাইরেক্টর জেনারেল ফোর্সেস ইনটেলিজেন্স (ডিজিএফআই), প্রতিরক্ষা গয়েন্দা ইউনিট সমূহ, ক্রিমিনাল ইনভেষ্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি), স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গোয়েন্দা সেল, স্পেশাল ব্রাঞ্চ- বাংলাদেশ পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) এর গোয়েন্দা সেল। তবে দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউ জড়িত থাকলে চাহিদা অনুযায়ী তথ্য দিতে বাধ্য।

তথ্য জানার অধিকার একজন সাধারন নাগরিকের যেমন রয়েছে, একজন সাংবাদিকের বেলায়ও সেটা প্রকাশ করা পেশাগত দায়িত্ব। আর দায়িত্ববোধ থেকেই সঠিক নির্ভূল তথ্য জনগনকে জানানো একজন সাংবাদিকের নৈতিক কর্তব্য।

সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক সময় সাংবাদিকের জীবন বিপন্ন হতে পারে।                 ‘সাংবাদিকদের জন্য বিপদজনক বাংলাদেশ’ শিরোনামটি বিশ্বমিডিয়ায় এরই মধ্যে দেশের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সাউথ এশিয়া মিডিয়া কমিশন (এসএমসি) ও দেশীয় গণমাধ্যম উন্নয়ন সংস’া ম্যাস লাইন মিডিয়া সেন্টার (এমএমসি) গবেষনা তথ্য জানানো হয়েছে বিগত বছরগুলোর তুলনায় ২০১২ সালে খুন, হত্যার হুমকিসহ সাংবাদিক নির্যাতন বেড়েছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশে ২১২টি সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় ৫১২ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন ৫ জন সাংবাদিক।  দেশবাসীকে বাকরুদ্ধ করেছে মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারওয়ার ও এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনি দম্পতির নিজ বাসায় খুন হওয়ার মর্মস্পর্শী ঘটনা। এছাড়াও যশোহরের সাংবাদিক জামাল উদ্দীন, নরসিংদী থেকে প্রকাশিত দৈনিক নরসিংদীর বানী পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার তালহাদ আহম্মেদ কাবিদ ও হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থেকে প্রকাশিত দৈনিক বিবিয়ানা পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার  জনাঈদ আহমেদ জুনেদ। একই গবেষণা রিপোর্টে তথ্য প্রমাণ সাপেক্ষে আরো বলা হয়েছে, সংবাদ প্রকাশের জের ধরে ১২৮ জন সাংবাদিক এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২৫৬ জন।

 

লেখক পরিচিতি: রায়হান আহম্মেদ রানা

সাংবাদিক ও কলাম লেখক

পিজিডি (সাংবাদিকতা) রাঃ বিঃ

বগুড়া