বগুড়ায় সংবাদপত্র প্রকাশনার ইতিবৃত্ত

–আব্দুর রহিম বগ্‌রা

 

 পটভূমি: বগুড়ায় পত্র পত্রিকামূখী প্রকাশনার কালপর্ব নির্ণয়ের ক্ষেত্রে গত শতাব্দীর ৪০ থেকে ৬০ দশককে ভিত্তি হিসেবে নিয়ে এই ইতিহাস চর্চার প্রয়াস আবর্তিত হয়ে আসছে। কিন্তু পোন্ড্র সভ্যতার আকর বগুড়ায়-এর কায়া, প্রবৃত্তি ও মানসিক প্রবনতা, সৃষ্টি নিয়ন্ত্রিত হবার ইতিহাস অতি প্রাচীন। তা যখন ৭ম শতাব্দীতে চীনা পর্যটক অধ্যাপক হিউয়েন সাং-এর সি-যুকী গ্রন্থে পৌন্ড্র’র সমাজ- সভ্যতা- সংস্কৃতির অনবদ্য বর্ণনা পাওয়া যায়। তখন ঐ খন্ডিত সময়কাল নির্ণয়ের আয়েশী প্রয়াসের ফলে এই জনপদের মানুষের যাবতীয় সাধনা ও সংস্কৃতিক সৃজনশীলতার পিছনের কথা ও চিহৃগুলি অনাবিস্কৃত থেকে যায়। অথচ এখানে মুক্তি, সৃজনশক্তির আবেগ সম্পন্ন মানুষ নিরন্তর সংগ্রাম ও বিপ্লবের সাহায্যে অজ্ঞানতার অন্তরায়গুলি অপসারন করে দ্যুতিময় বৈশিষ্ট্য দানের ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। সেই দ্যুতিময় শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির আলোয় আলোকিত হতে ছুটে এসেছেন প্রাচ্যের জ্ঞানপিপাসু মানুষ। পৌন্ড্রনগরে এক বছর অবস্থানকালে হিউয়েন সাং প্রাচ্যের সাত শতাধিক আবাসিক ছাত্রকে দেখেছেন ভাসুবিহারে। তা বগুড়ার উত্তর-পশ্চিম চৌহিদ্দীতে অবস্থিত। সেখানে আজ অতীত সভ্যতার খুলিটি আছে, মুকুট নেই। মুকুট যে ছিল তাতো অধ্যাপক হিউয়েন সাং-এর সিয়ুকি গ্রন্থেই পাওয়া যাচ্ছে। মৌর্য আমলে গাঙ্গেয় উপত্যাকার পূর্ব প্রান্তে প্রাচীন বাংলার নগরায়নের সূত্রপাতের তথ্য পাওয়া গিয়েছে বগুড়ার মহাস্থানে (পৌন্ড্র নগর তথা পৌন্ড্র বর্ধনের রাজধানী) আবিস্কৃত ‘লেখ’ থেকে।

লেখটির হরফ মৌর্যকালীন ব্রাহ্মী লিপির সঙ্গে তুলনীয়। সেখানে পুডনগল বা পৌন্ড্রনগরের উল্লেখ আছে। লেখতে বলা হয়েছে ‘সুমাতে সুলখিতে পুডনগলতে বা পৌন্ড্রনগর সুমাত্রাযুক্ত বা সুবিন্যাস্ত ও সমৃদ্ধশালী বা সূলক্ষ্ণীত। কৌটিলীয় অর্থশাস্ত্রে ‘দুর্গ নিবেশ’ অধ্যায়নে নগরায়নের যে কথা বলা হয়েছে তার সূত্রপাত ঘটেছিল অতীত বগুড়ার পৌন্ড্রবর্ধনে। সু-সংস্কৃতির বিকাশ ও বিস্তৃতি হয়েছে এই জনপদ থেকে। নাথ সন্ন্যাসীদের হাতে রচিত হয়েছে লিরিক বা গীতিকাব্য, তারা পৌন্ডবর্ধন রাজ্যের বিভিন্ন ‘সংঘারাম’ বা ‘বিহারের’ অধিবাসী ছিলেন।

‘পৌন্ড্রবর্ধন রাজ্যেই বাংলা ভাষার উৎকৃর্ষ স্থান। মধ্যযুগের পূর্বে বাংলা কবিতার কোন বিশেষ ছন্দ ছিলনা। যাহা ছিল তাহা নিয়মহীন পয়ার। মধ্যযুগেই পৌন্ড্রবর্ধন রাজ্যে ফার্সীর অনুকরণে পয়ার, একপদী, দ্বিদী, ত্রিপদী, চৌপদী, পঞ্চপদী, ষষ্ঠ ও সপ্তপদী ছন্দ বাংলা কাব্যে প্রচলিত হয়। পৌন্ড্রবর্ধন, রাজ্যের পুথিকাররাই প্রথমে মানুষের প্রেম, কাব্যে স্থান দেন। জীবনী কাব্য, ঐতিহাসিক কাহিনী কাব্য, BwZnvm,¯^v¯’¨ তত্ত্ব, ¯^cœ বিচার প্রভূতি পৌন্ড্রবর্ধনের পুঁথি সাহিত্য সৃষ্টি হইবার পূর্বে বাংলা সাহিত্য ছিল না। জেলা হিসেবে বগুড়ার সৃষ্টি ১৮২১ খ্রীষ্টাব্দে। কিন্তু ইহার আড়াই হাজার বছর পূর্বে পৌন্ড্রবর্ধনে ছিল তাহার ভাষা এবং সাহিত্য ছিল’। (বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পুন্ড্রবর্ধনের দান, নাজিরুল ইসলাম সুফিয়ান)। পৌন্ড্রবর্ধনের অধিবাসীগণ বিদ্যানুরাগী, নাট্যপ্রিয় ও সমৃদ্ধশালী ছিল, এখানকার প্রসিদ্ধ স্কন্দ মন্দিরের নাট্যশালায় ভারতের নাট্যশাস্ত্রানুযায়ী নাট্যভিনয় হইত। নগরের সুশাসন, সমৃদ্ধি ও ভবনবিভব দর্শনে কাশ্মীর রাজ ললিতাদিত্যের পৌত্র জয়াপীড় বিনয়াদিত্য মুগ্ধ হয়েছিলেন। এখানে তিনি রুপ ও নৃত্য-নৈপূণ্যে দেব নর্তকী কমলার প্রতি আকৃষ্ট হন। এসব কিছুই হচ্ছে বগুড়ার প্রাচীন সাংস্কৃতির নান্দনিক রুপ বৈচিত্রের ইতিহাসের অংশ বিশেষ।

তাই এই জনপদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজ-সভ্যতার ও শ্রেনী বিন্যাসের রুপান্তরের ক্রমোন্নতির ইতিহাসের উত্তরাধিকার হিসেবে শিক্ষা-সংস্কৃতি বোধ-বিশ্বাস ও চেতনার বাহন পত্র-পত্রিকা প্রকাশের বিকাশ ও ব্যাপ্তি বগুড়াকে আজ এক অনন্য বৈশিষ্ট্যতা দান করেছে। নির্দিষ্ট একটি দশকের মধ্যে বগুড়ার সাংস্কৃতি কর্মকান্ডকে সীমিত করা কেন? তার ঐতিহাসিক তথ্য প্রকরণের ভান্ডারতো অপূর্ণ নয়। একাদশ শতকের বগুড়ার বৈঞ্চর কবি জয়দেব †Mv¤^vgxi গীতি অনুসরণ করে রচিত হয়েছে ‘বন্দে মাতরম’ দেশ বন্দনা। একাদশ শতকের আরেক কবি জীবনকৃঞ্চ মৈত্র ‘মনসা মঙ্গল’ (বেহুলা ভাষান) কাব্যের আদি কবি।

কবি সন্ধ্যাকার নন্দী রামপালের সভা কবি, ‘রামচরিতম কাব্য রচনায় একই পংত্তিতে রামায়ণের শ্রী রামচন্দ্র ও পৌন্ড্ররাজা রামপালের মহিমা বর্ননায় দ্বিবিধ ব্যাখ্যায় লিপি কৌশল প্রদর্শন করে অমরত্ব লাভ করেছেন। গৌড়ের মহারাজাধিরাজ বল্লাল সেনের শিক্ষক শ্রী অনিরুদ্ধ ভট্র ছিলেন বগুড়ার শিবগঞ্জ থানার বিহার গ্রামবাসী। তার রচিত গ্রন্থ ‘সংখ্যাদর্শনের টীকা’ ও ‘হারলতা’। হারলতা নামক স্মৃতি সংগ্রহমূলক গ্রন্থটি এশিয়াটিক সোসাইটির অনুমক্রিমে পন্ডিত শ্রী কমলকৃঞ্চ কর্তৃক ১৯০৯ খ্রীষ্টাব্দে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। ১৮৬১ খ্রীষ্টাব্দে গোলাম মোহাম্মদ ফার্সি ভাষায় ‘সেতিহাস বগুড়া’ রচনা করেন। পরবর্তীতে তা সংস্কৃত ও ফারসী ভাষার সুপন্ডিত বগুড়ার শেরপুর থানার অধিবাসী শ্রী হরগোপাল দাসকুন্ডু ও পঞ্চানন চাকী বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন। বগুড়া জেলার প্রাচীন ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে পরবর্তীকালের লেখকদের কাছে ওই বইটিই Aej¤^b হয়েছে। বইটি এখন দুস্পাপ্য। পুঁথি, পুরান, গীতি, কবিতা ও কাব্যসম্ভারে বগুড়ায় তাই পত্র-পত্রিকা প্রকাশনার উদ্যোগ যুক্ত হবার সময়কালটাও গর্ব করার মতো।

সূচনাকাল:

বাংলা ১২৮৮ সাল, ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দে বগুড়া শহর থেকে ‘বিশ্ববন্ধু’ নামক প্রথম একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশের সফল উদ্যোগটি নিয়েছিলেন তৎকালীন শিক্ষিত সুধিমহলে সুপরিচিতি দার্শনিক লেখক কিশোরী লাল রায়। তা ছিল বগুড়া থেকে প্রকাশিত তৎকালীন উত্তরবঙ্গে সর্বপ্রথম মাসিক পত্রিকা।  

তার সম্পাদনায় পত্রিকাটি সুধি পাঠক সমাজে সমাদৃত হয়েছে। তিনি ‘রঙ্গপুর দিকপ্রকাশ’ পত্রিকা কার্যালয়ের অধ্যক্ষ পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন। কিশোরী লাল রায়ের জ্ঞান প্রতিভার কথা তখন সর্বত্র। বৃহত্তর রংপুরের বিদ্যোৎসাহী ও সংস্কৃত সেবী জমিদার রাজা মহিমারঞ্জন রায় চৌধুরী তাকে তার পুত্রের অভিভাবক ও শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করেন। এজন্য কিশোরী লাল রায়কে বেশ কবছর কাকিনায় অতিবাহিত করতে হয়েছে। কাকিনার উক্ত জমিদারের বিরাট কাছারী বাড়ী বগুড়া শহরেও ছিল। ( কিশোরী লাল রায় সর্ম্পকে তথ্যসূত্র: বগুড়ার ইতিহাস পৃ:৪০৪, প্রভাস চন্দ্র সেন বিএল। বগুড়া চরিতকোষ,পৃ:১১৫, আখতার উদ্দিন মানিক। স্মৃতি চারন, কবিরাজ হাফিজার রহমান, শিববাটি মহল্লার প্রবীন ব্যাক্তি। ‘কিশোরী লাল রায় লেন’নামে শিববাটিতে একটি রাস্তা রয়েছে)।

কিশোরী লাল রায় জন্মগতভাবে বিরল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি দার্শনিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। যেমন বাংলায় তেমনি ইংরেজীতে সুপন্ডিত ছিলেন। ¯^cœ`~Z, শকুন্তলা নাটক, দেবতত্ত্ব, মনোহর সঙ্গীত, তান্ত্রিক অভিধান প্রভূতি বাংলা ও সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করেন। বিশেষ করে ইংরেজী ভাষায় রচিত ‘ফ্রি নিকোয়্যারী আফটার ট্রুথ’ ও ‘এছে অন হ্যাপিনেস’ খ্যাতির শীর্ষে পৌছে দিয়েছিল। বগুড়া শহরের শিববাটী মহল্লার বিখ্যাত ‘রায়লজ’-এ বাংলা ১২৪৬ সালের মাঘ মাসে কিশোরী লাল রায়ের জন্ম। তার পিতা-মাতা ছিলেন কৃঞ্চ লাল রায় ও রসসুন্দরী। বগুড়া শহরের রহমান নগরে শিশু মঙ্গল হাসপাতাল সংলগ্ন স্থানে ছিল কাঁকিনার জমিদার মহিমারঞ্জনের কাছারী বাড়ী। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তা অবাঙ্গালীদের কলোনী হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। পরবর্তীতে পাওয়া যায় ‘আর্য্য দর্পন’ পত্রিকার কথা। তা ছিল ধর্ম ও নীতিজ্ঞান বিষয়ক। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন ¯^vgx প্রেমানন্দ। তিনি ছিলেন বগুড়া শহরের চেলোপাড়ায় অবস্থিত ¯^i¯^Zx আশ্রম-এর সাধক ও পরিচালক। ‘আর্য্য দর্পন’ পত্রিকার সমসাময়িক ‘জ্ঞানাকুর’ সাহিত্য বিষয়ক পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে বগুড়া থেকে। এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায়। পত্রিকা দুটি উনিশ শতকের শুরু ও মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশিত হয়েছে।

বগুড়ার ব্রাহ্ম্য ধর্মের নীতিকথা বিষয়ক একাধিক পত্রিকা ও সাময়িকী প্রকাশ হয়েছে। বগুড়ার ব্রাহ্ম সমাজ ধর্মের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ডা.প্যারি শংকর দাশগুপ্তের সম্পাদনায় ব্রাহ্ম ধর্মের নীতিকথা বিষয়ক একাধিক পত্রিকা ও সাময়িকী প্রকাশ পেয়েছে। বগুড়ায় প্রথম রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে প্রকাশিত পত্রিকাটির নাম ছিল ‘বগুড়া বার্তা’। সাম্রাজ্যবাদ ব্রিটিশ বিরোধী ¯^‡`kx আন্দোলনের অগ্নঝরা দিনগুলিতে এই পত্রিকা বগুড়া থেকে প্রকাশ হয়েছে। পত্রিকাটি গোপনভাবে (আন্ডারগ্রাউন্ড) হাতে লিখে প্রকাশ করা হতো। এর সম্পদনার কাজে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন বগুড়ার কংগ্রেস নেতা ড.প্যারি শংকর দাসগুপ্ত, দার্শনিক লেখক কিশোরী লাল রায়, কবি মাধব চন্দ্র রায়, ডা.বেনী চাকী প্রমূখ। (‘বগুড়া বার্তা’ সর্ম্পকে প্রাপ্ত তথ্যের সূত্র:রামশংকর দাসগুপ্ত, তিনি ছিলেন প্যারি শংকরের ছেলে, দূর্গাদাস মূর্খাজ্জী সাংবাদিক, সম্পাদক)। বগুড়া থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘দেশের কথা’তৎকালীন স্থানীয় কংগ্রেস দলীয় রাজনীতির মূখপত্র ছিল। সাপ্তাহিক হিসেবে পত্রিকাটি ৪ বছর নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তৎকালীন বগুড়া লোন অফিস (ব্যাংক) এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর বাবু ললিত মোহন স্যানাল। বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতা সুরেশ দাশ গুপ্ত ও ডা.যোগেন্দ্র চন্দ্র চৌধুরী পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। মূদ্রাকর ছিলেন জিতেন্দ্র নাথ চৌধুরী। বগুড়া শহরের বড়গোলায় ‘ব্যাংকিং এন্ড ট্রেডিং মেশিন প্রেস’ থেকে পত্রিকাটি প্রকাশ হতো। বাংলা সাল ১৩৩২ থেকে ১৩৩৬ ইংরেজী ১৯২৫ হতে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত সাপ্তাহিক ‘দেশের কথা’ প্রকাশিত হয়েছে।

জানা যায়, পত্রিকাটি রাজনৈতিক মতাদর্শগত কারনে বন্ধ হবার পর কংগ্রেস নেতা সুরেশ চন্দ্র দাশগুপ্ত ‘ সাপ্তাহিক করতোয়া’ নামে পত্রিকা প্রকাশ করেন। সে সময়কালটা ছিল ১৩৩৬ বাংলা, ইংরেজী ১৯২৮। কৃষক তথা প্রজা আন্দোলনের মূখপত্র হিসেবে বাংলা ১৩৩০ ইংরেজী ১৯৩২ সাল থেকে ‘সাপ্তাহিক প্রজাবাহিনী’ পত্রিকা দীর্ঘ ৪০ বছর প্রকাশিত হয়েছে। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন প্রজা আন্দোলনের বলিষ্ঠ নেতা অবিভক্ত বাংলার আইন পরিষদ সদস্য প্রজাবন্ধু রজিব উদ্দিন তরফদার। তার রাজনৈতিক সহকর্মী তৎকালীন প্রসিদ্ধ বাগ্মী এছাহাক গোকুলী পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন। ইছাহাক গোকুলী ছিলেন কৃষক প্রজাপার্টির অন্যতম সংগ্রামী নেতা। তিনি ছিলেন বগুড়া সদরের গোকুলের বাসিন্দা। জমিদার প্রথা উচ্ছেদ আন্দোলনে প্রজাবন্ধু রজিব উদ্দিন তরফদারের বিশ্বস্থ সহকর্মী ছিলেন তিনি। বগুড়ার প্রবীন সাংবাদিক অধ্যাপক আইয়ুব হোসেনের পিতা ছিলেন ইছাহাক গোকুলী। পরবর্তীতে আরও যারা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মাওলানা মোঃ আরেফুর রহমান সুধারামী, মোঃ ফজলুল বারী বিএল প্রমূখ। পত্রিকাটির সামন্তবাদ বিরোধী রাজনৈতিক চরিত্র ছিল। বিশেষ করে সামন্ত শ্রেনী তথা জমিদারদের থেকে বগুড়ার রাজনৈতিক কতৃত্ব মধ্যবিত্ত ও সাধারন মানুষের মধ্যে আয়াত্তাধীন করার ক্ষেত্রে সাহসী ভূমিকা রেখেছে। এই রাজনৈতিক বৈশিষ্টের কারনে পত্রিকাটি সাধারন মানুষের আস্থা অর্জন করেছিল। বগুড়া শহরের নাভীমূল সাতমাথায় প্রজাবাহিনী প্রেসটি আজও পত্রিকার নামের গর্বিত স্মৃতি বহন করছে। প্রজাবাহিনী পত্রিকার সমসাময়িক ‘সাপ্তাহিক বগুড়ার কথা’ নামে পত্রিকাটি ১৯২৩ সালে জন্ম নিয়ে প্রায় ৪০ বছর টিকে ছিল। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন ডা.ইছাহক এলএমএফ। যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন মীর বক্স এলএলবি। প্রকাশনায় ও ব্যাবস্থাপনায় ছিলেন হেকিম মোঃ আকরাম হোসেন ও পেশকার আকবর উদ্দিন মন্ডল। জানা যায়, এই পত্রিকাটি প্রকাশনায় তৎকালিন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যাক্তিত্ব খান বাহাদুর ইব্রাহিম হোসেনের বিশেষ অবদান ছিল। বিভিন্ন সময় ‘সাপ্তাহিক বগুড়ার কথা’র সম্পাদক ছিলেন তৎকালীন বগুড়ায় চিকিৎসা পেশায় hk¯^x অর্জনকারী ডা. মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ। বগুড়া প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ। বগুড়ার ব্যাংকিং এন্ড ট্রেডিং মেশিন প্রেস বড়গোলা থেকে ছাপা হতো। বগুড়ার তৎকালীন সম্ভ্রান্ত সমাজের সামপ্রদায়িক ও শ্রেনীগত রাজনৈতিক অবস্থানকে জনসমর্থিত করার জন্য পত্রিকা প্রকাশনার ঝুঁকি নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন। তবে তা নিজ নিজ পরিমন্ডলের সামপ্রদায়িক ¯^v_© চিন্তার উর্র্ধ্বে উঠে অসামপ্রদায়িক বোধ-বুদ্ধি ও চেতনার উন্মেষ ঘটানোর মনোভাব থেকে নয়। এ পর্যন্ত আলোচিত পত্রিকাগুলির সাংবাদিক ও লেখকদের সমপ্রদায়গত জোটবদ্ধতা সেই দিকে ইঙ্গত করে বৈ কি?

সাপ্তাহিক ‘দেশের কথা’পত্রিকার সম্পাদকমন্ডলী ও প্রকাশকের নাম পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। পত্রিকাটিতে সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে আর যারা সংশ্লিষ্ট ছিলেন তারা হলেন সারদা নাথ খাঁ বিএল, বগুড়ার ইতিহাস গ্রন্থের লেখক ঐতিহাসিক প্রভাসচন্দ্র সেন প্রমূখ। পত্রিকাটি স্থানীয় কংগ্রেস দলীয় রাজনীতির নিদের্শিত পথে চলতো। সাপ্তাহিক করতোয়া পত্রিকার সাংবাদিক ও লেখকদের সমাবেশ থেকে লক্ষ্য করা যায় যে, পত্রিকা কর্তৃপক্ষ নিজ সমপ্রদায় শ্রেনী প্রীতির উর্ধে উঠে অসামপ্রদায়িক মুক্ত চিন্তার বৃত্ত রচনা করতে পারেননি। এ পত্রিকা প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন বগুড়ার তৎকালীন কংগ্রেস নেতা সুরেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত। তাই দেখা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ বাটোয়ারার পর উল্লেখিত ব্যাক্তিদের অধিকাংশের কলকাতামূখী হবার কারনে পত্রিকাগুলির প্রকাশনার ধারাবাহিকতা রক্ষায় আর কেউ এগিয়ে আসেননি। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, রাজনৈতিক প্রযোজন শেষ হবার পর অনুরুপভাবে ‘সাপ্তাহিক বগুড়ার কথা’ পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেছে। এই পত্রিকাতে স্থানীয় মধ্যবিত্ত মুসলিম বুদ্ধিজীবী শ্রেনীর সমাবেশ ঘটেছিল। তার সর্বশেষ সম্পাদক ছিলেন ও প্রকাশনার জন্য অর্থ কড়ি ব্যয় করেছেন ডা. মফিজুর রহমান। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ বাটোয়ারার পর প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির ফারাক দেখে দ্রুত বদলে যেতে থাকে সারা দেশের মতো বগুড়ার মানুষের ভাবনালোক। পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও শাসক গোষ্ঠীর নিপীড়ন ও নিবর্তন বিরোধী মনোভাব থেকে বুদ্ধিবৃত্তি শ্রেনীর মানুষের মধ্যে সংগ্রামী চেতনা দানা বাঁধতে থাকে। শুরু হয় চেতনা প্রকাশের নতুন উদ্যোগ আয়োজন। এ যাত্রায় দেখা যায় সাপ্তাহিক উত্তরবঙ্গ ও সাপ্তাহিক নিশান পত্রিকা প্রকাশ হতে। উত্তরবঙ্গ নামে পত্রিকার বিরুদ্ধে আঞ্চলিক ও বিছিন্নতার মনোভাব সৃষ্টির অভিযোগ ও বৈরী পরিস্থিতির কারনে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ করে দেন। সাপ্তাহিক উত্তরবঙ্গ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন মজির উদ্দিন আহম্মেদ। ঐ পত্রিকার প্রকাশনার সময়কাল ১৯৪৮। ১৯৪৯ খ্রীষ্টাব্দে তিনি সম্পাদক হয়ে প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক নিশান। স্থানীয় আজিজুল হক মহাবিদ্যালয় (তখন বেসরকারী ছিল) এর অধ্যক্ষ বহু ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর সম্পাদনায় ১৯৪৮ খ্রীষ্টাব্দে বগুড়া থেকে ‘তকবীর’ নামে পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ হয়েছে। ১৯৫৭ খ্রীষ্টাব্দে আবেদুর রহমান মোক্তার-এর সম্পাদনায় পাক্ষিক ‘আনছার’ ১৯৬৩ খ্রীষ্টাব্দে অধ্যক্ষ মহসীন আলী দেওয়ান ও আমান উল্লাহ খানের সম্পাদনায় প্রকাশ হয়েছে পাক্ষিক ‘বগুড়া বুলেটিন’। পরবর্তীতে অধ্যক্ষ মহসীন আলী দেওয়ান প্রকাশ করেন ‘উত্তরবঙ্গ বুলেটিন’। এ পত্রিকাটি ছিল অর্ধ সাপ্তাহিক। ১৯৪৬ খ্রীষ্টাব্দে অধ্যক্ষ জিল্লুর রহমানের সম্পাদনায় প্রকাশ হয় সাপ্তাহিক উত্তর বার্তা, ১৯৭০ খ্রীষ্টাব্দে অধ্যাপক তবিবুর রহমান প্রকাশ করেন ‘সাপ্তাহিক উত্তরসুর’। ১৯৬৮ সালে কে এম বারী কবিরাজ-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক সন্ধানী। এই পত্রিকায় সে সময় উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন বৈষম্যের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হতো। যমুনা সেতুর দাবীতে ঐ পত্রিকায় একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ পায়। কে এম বারী কবিরাজ (খন্দকার মোফাজ্জল বারী) ১৯৭১-এর ২৩ এপ্রিল বগুড়া শহরের কাটনার পাড়া বাসভবনে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে শাহাদতবরন করেন। যাহেদুর রহমান যাদু ও জাবেদুর রহমানের সম্পদনায় ১৯৭০ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশ পায় ‘সাপ্তাহিক সমাচার’। তারপর ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দের ১৬ wW‡m¤^i ¯^vaxb সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়। ¯^vaxbZvi উষালগ্নে ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দের ৩০ wW‡m¤^i †ZR¯^x মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সদস্য অভিজ্ঞ সাংবাদিক আমান উল্লাহ খান সর্বপ্রথম বগুড়া থেকে তথা রাজধানী ঢাকার বাইরে gd¯^j জেলা শহর থেকে ‘দৈনিক বাংলাদেশ’ নামে দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করে রীতিমত চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেন। ১৯৭৩ খ্রীষ্টাব্দে ‘সাপ্তাহিক গনঐক্য’ পত্রিকা প্রকাশ হয়। এর সম্পাদক ছিলেন যাহেদুর রহমান যাদু, প্রকাশক ছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য মোস্তাফিজার রহমান পটল। ১৯৭৪ সালে খন্দকার আব্দুর রহীম প্রকাশ করেন ‘সাপ্তাহিক বর্তমান’। ১৯৭৯ খ্রীষ্টাব্দে সুফিয়া বেগমের সম্পাদনায় বের হয় মহিলাদের পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক কাঁকন’। সাপ্তাহিক পত্রিকার তালিকা অনুসন্ধানে আরো পাই ‘সাপ্তাহিক গনরায়’ এর সম্পাদক ছিলেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মো: এনামুল হক তপন, সাপ্তাহিক শরনী- এর সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: শাহ আলম, সাপ্তাহিক জীবন পত্রিকাটির সম্পাদক অধ্যক্ষ নূর আফরোজ বেগম জ্যোতি। সাপ্তাহিক নওজোয়ান, এর সম্পাদক ছিলেন আানোয়ারুল হক আনু। এসব পত্র-পত্রিকা জেলা সদর থেকে প্রকাশিত হয়ে এলেও বেশ ক’বছর হলে শহরের গন্ডি পেরিয়ে শেরপুর উপজেলা থেকে সাপ্তাহিক আজকের শেরপুর, সম্পাদক মো: সাইফুল ইসলাম ডাবলু, বিজয় বাংলা, সম্পাদক মো:আকরাম হোসেন, তথ্যমালা, সম্পাদক সুজিত বসাক ও উত্তরাঞ্চল বার্তা, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আমজাদ হোসেন মিন্টু। কোন উপজেলা থেকে নিয়মিতভাবে ৪টি পত্রিকা প্রকাশনার ঘটনা সেই উপজেলার গনমানুষের উন্নত চেতনার মান নির্দ্দেশ করে বৈকি? এছাড়া শিবগঞ্জ উপজেলা থেকে প্রকাশিত হচ্ছে সাপ্তাহিক তৃনমূল বার্তা, সম্পাদক তৌহিদুর রহমান মানিক ও নন্দীগ্রাম উপজেলা থেকে সাপ্তাহিক তাজা খবর, সম্পাদক আনোয়ার হোসেন রানা।

¯^vaxbZv উত্তর বগুড়ায় পত্রিকা প্রকাশনার এক উর্বর প্রেক্ষাপটে দৈনিক বাংলাদেশ-এর পর ১৯৭৬ খ্রীষ্টাব্দের ১২ আগষ্ট দৈনিক করতোয়া’র আত্মপ্রকাশ ছিল পরবর্তীকালে বগুড়া থেকে আরও অনেক পত্রিকা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে নির্ভয় এবং সাহসের ভিত্তি। আজ তাই বগুড়াকে বলা হচ্ছে পত্রিকার শহর। দৈনিক বাংলাদেশ, দৈনিক করতোয়া, দৈনিক উত্তরাঞ্চল, দৈনিক উত্তরবার্তা, দৈনিক মুক্তবার্তা, দৈনিক চাঁদনী বাজার, দৈনিক আজ ও আগামীকাল, দৈনিক সাতমাথা, দৈনিক দুর্জয় বাংলা, দৈনিক বগুড়া, দৈনিক উত্তরকোন, দৈনিক সকালের আনন্দ, দৈনিক সংবাদ কনিকা, দৈনিক কালের খবর, দৈনিক মুক্ত সকাল, দৈনিক উত্তরের খবর, দৈনিক বুলেটিন, দৈনিক সকলের খবর, দৈনিক মহাস্থান, দৈনিক আলো প্রতিদিন, দৈনিক প্রভাতের আলো। মোট ২১টি ¯^í আয়তনের এই বগুড়া জেলা থেকে প্রকাশ হচ্ছে প্রতিদিন। তবে এর মধ্যে কযেকটি অনিয়মিতভাবে প্রকাশ হচ্ছে। পৌন্ড্র যুগের সমাজ সভ্যতা ও সংস্কৃতির দ্যুতির মতই আজ বগুড়া তার সাংস্কৃতিক সৃজনশীলতার দ্যুতি প্রতিদিন ছড়িয়ে দিচ্ছে সমগ্র উত্তর জনপদ-বাংলাদেশে।

 

লেখক পরিচিতি: আব্দুর রহিম বগ্‌রা

সাংবাদিক ও ইতিহাস অনুসন্ধানী লেখক

ব্যুরো চীফ বাংলাভিশন টিভি, বগুড়া অফিস