———–

সাংবাদিকতায় আমার প্রথম চাকুরী

প্রথম মাসের বেতন প্রথম প্রমোশন

এবং সেই স্মৃতি

মীর্জা সেলিম রেজা    

১৯৭৮ সালের মার্চ মাসের দিক। তখন আমি লেখাপড়া করছি। ইন্টারমিডিয়েটে মোটামুটি ভাল রেজাল্ট করে অনার্সে ভর্তি হয়েছি। ভাগ্যক্রমে ঢাকার কলাবাগানের হাজী বছির উদ্দিন লেনের একটি বাড়িতে আমাকে লজিং থাকতে হলো। যার বাড়িতে লজিং থাকি সে ভদ্রলোক একজন ব্যাটারী ব্যবসায়ী। কমার্স ব্যাটারী নামে তার এক কোম্পানী ছিল। ফরিদপুর নিবাসী এই ভদ্রলোকের নাম আব্দুস সাত্তার। এ বাড়িতে আমার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো তার ৭ম ও ৮ম শ্রেণী পড়–য়া দুই কন্যা এবং এসএসসি পরীক্ষায় তিনবারের মত অকৃতকার্য এক ছাত্রকে পড়াতে হবে। নাসির উদ্দিন নামে এই ছাত্রের সঙ্গে প্রথম দিন দেখা হতেই দেখলাম ছাত্রটির মুখে বিরাট দাঁড়ি। ছাত্রকে দেখেই আমি চমকে গেলাম, মনে হলো আমার চেয়ে ছাত্রের বয়সই বেশী। প্রথম দিনই ছাত্রটির কথা শুনে ভয় পেয়ে গেলাম। অতি বিনয়ের সাথে হেসে বললো, স্যার আপনাকে একটা কথা বলি। আমাকে ম্যানেজ করে চললে আপনি যতদিন খুশি এখানে থাকতে পারবেন। আপনি যদি আমার সম্পর্কে বাবাকে রিপোর্ট দেন যে, ‘আমি খুব ভালভাবেই লেখাপড়া করছি’। এর বিনিময়ে আপনি কিছু টাকা ও খাবার পাবেন। শিক্ষকের প্রতি ছাত্রের এ ধরনের প্রস্তাব শুনে আমার গা ঘেমে উঠলো। আমি হ্যাঁ/ না কিছুই বললাম না। মনে মনে বললাম, না জানি কি আছে কপালে! তবে ছাত্রী দুটো খুবই ভদ্র। যা হোক, ঢাকায় পড়াশোনার পাশাপাশি লজিং থেকে শিক্ষকতা চলছিল। এভাবে চলছিল জীবন। ভাবলাম পড়াশোনার পাশাপাশি একটা চাকরী করা দরকার। কেননা লজিং থেকে খাওয়া চললেও চলার মত পর্যাপ্ত টাকার প্রয়োজন। তাই আব্বাকে বলার পর আব্বা ( মির্জা আমজাদ হোসেন) একটি চিঠি দিলেন। সে সময় ঢাকা থেকে প্রকশিত হতো দৈনিক জনপদ। সেই জনপদ পত্রিকায় স্বনামধন্য সাংবাদিক গাফফার চৌধুরী, মরহুম মোহাম্মদ হোসেন, অধ্যাপক সিরাজুল হক সাহেব চাকুরী করতেন। মানুষের সাথে কথা বলার সময় খুবই লজ্জাবোধ করতাম। একদিন মনের ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ঢাকার বাংলাবাজারস্থ ২/৩ শিশির দাস লেনের দৈনিক জনপদ অফিসে গেলাম। তৎকালীন দৈনিক জনপদের নির্বাহী সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন  সাহেবের হাতে আব্বার চিঠিটা দিলাম। চিঠি পড়ে তিনি কর্মরত সকল সাংবাদিকের সামনে চোখ দুটো বড় করে আমার দিকে তাকালেন। মোহাম্মদ হোসেন সাহেবের গায়ের রং ছিল কালো কুচকুচে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কিন্তু তাৎক্ষণিক ভাবে তিনি হেসেন বললেন, ওহ, তুমি মীর্জা সাহেবের ছেলে। তোমার চাকরি প্রয়োজন…। আচ্ছা কাল একটা বায়োডাটা নিয়ে এসো। তোমার ইন্টারভিউ নিয়ে কাজ দেবো। আফটার অল, তুমিতো অনেক দুর থেকে এসেছো। তাছাড়া তোমার বাবা আমার পুরনো বন্ধু…। চাকরির নিশ্চয়তা পেয়ে মনে মনে আয়তুল কুরসী পড়তে পড়তে বাস ধরে গুলিস্তান নেমে যথারীতি রমনা পার্কের সবুজ মাঠ পেরিয়ে কলাবাগানে চলে এলাম। ছাত্র ছাত্রীদের পড়াতে পড়াতে রাতে শুধু একটি কথাই মনে হতে লাগলো কখন ভোর হবে এবং বায়োডাটা নিয়ে দৈনিক জনপদ অফিসে যাবো।

পরেরদিন দিনের বেলা যাওয়া হলো না। সন্ধ্যার পর গেলাম। সাধারণত পত্রিকা অফিস সন্ধ্যার পর থেকেই জমজমাট হয়। নির্বাহী সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেনের মুখোমুখি হতেই তিনি হেসে আমাকে বসতে বললেন। পিয়নকে এক কাপ চা দিতে তাগাদা দিলেন। একটু পরে তিনি ডেস্কের শিফট ইনচার্জ মোজাম্মেল হককে বললেন, ওর একটা ইন্টারভিউ নিনতো। স্বাভাবিক ভাবেই ইন্টারভিউয়ের মুখোমুখি হতে মনে ভয় জাগলো। যা হোক, প্রথমেই আমাকে অনুবাদ করতে দেয়া হলো। টেলিপ্রিন্টার থেকে নেয়া সংবাদ সংস্থা এপি ও এএফপির নিউজের শ্লাগগুলো সামনে দেয়া হলো। ভ্যাগ্যিস আব্বার সংস্পর্শে থেকে এ সংক্রান্ত কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল। সাধ্যমত ইংরেজী নিউজগুলো ভাবানুবাদ করলাম। মোজাম্মেল হক সাহেব বললেন, এবার আপনি বসুন। সবার সামনে ঠাঁই এক ঘণ্টা বসে রইলাম, অনেকটা বোকার মত। সবাই অপরিচিত, কেউবা আবার আমার চেহারা ও গরীবানা বেশ দেখে টিটকারী মারতে লাগলেন, অনেকে আবার ভ্রকুটি কেটে মুচকি হাসলেন। অবশেষে নির্বাহী সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন জানতে চাইলেন, কি খবর হলো, উত্তর এলো, ‘খুব ভালো না’, তবে চলবে। আমাকে পাঠানো হলো বার্তা সম্পাদক অধ্যাপক সিরাজুল হকের কাছে। অধ্যাপক সিরাজুল হক বরিশালের লোক, তিনি আমার আব্বা মীর্জা আমজাদ হোসেনের বন্ধু। তিনি আমাকে আদরের সাথে বললেন, ভয় পেয়ো না, কাল থেকে তুমি জয়েন্ট করো। তবে জুনিয়র সাব এডিটর হিসেবে। ভাল কাজ করলে অবশ্যই ফল পাবে। চাকুরী হয়ে গেল। কিন্তু কত বেতন হবে তা ভয়ে জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। চাকরির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরে মনে খুব আনন্দ লাগলো। মনে হলো আমি বিরাট কিছু পেয়েছি। দৈনিক জনপদে যোগদান করার পর বুঝতে পারলাম ঢাকায় ‘টিপটপ’ থাকার বিষয়টি বেশ মূল্যায়িত হয়। অনেক উঁচু লোক এমনকি বিত্তবান ঘরের লোকজনও শখের বশে সাংবাদিকতা পেশায় আসেন। অনেকেই নিজ কারে করে অফিস করেন, অবশ্য এমন ধরনের সাংবাদিকদের সংখ্যা খুব একটা বেশী নয়।

কাজ করার সাত দিনের মাথায় মালিক- সম্পাদক জনাব হাবিবুদ্দিন এর পিএ নজরুল ইসলাম বললেন, মীর্জা ভাই আপনি যাওয়ার সময় অ্যাকাউট্যান্ট এর সঙ্গে দেখা করবেন। একথা শুনেই আমি আবার আঁতকে উঠলাম। মনে শংকা জাগলো, বোধহয় আমার পারফরমেন্সে কর্র্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট নয়। তাই বোধ করি জবান দিয়ে দেবেন। কাজ শেষে এ্যাকাউন্টের সাথে দেখা করলাম। সালাম ঠুকে আমার নাম বলার পর তিনি হেসে আমাকে বসতে বললেন। সাথে চা-র অর্ডার দিতে ভুললেন না। মিটিট পাঁচেক পর ভদ্রলোক তার হাতের কাজ শেষ করে আমাকে একটি চিঠির খাম দিলেন। বললেন আপনার ‘অঢ়ঢ়ড়রহঃসবহঃ খবঃঃবৎ’ খুলে দেখুন। আনন্দে মন ভরে উঠলো। প্রথম পেশাগত জীবনের প্রথম নিয়োগপত্র। খুলে দেখলাম জুনিয়র সাব এডিটর হিসেবে কর্তৃপক্ষ আমাকে নিয়োগ দিয়েছেন। বেতন ৭৫০ টাকা। খাতায় স্বাক্ষর দিয়ে চলে আসার আগেই একাউনট্যান্ট ভদ্রলোক বললেন, আপনাকে এক মাসের টাকা এ্যাডভান্স দেয়া হয়েছে। যা প্রতিমাসে ১০০ টাকা করে কেটে নেয়া হবে। প্রথম সাংবাদিকতার চাকুরির প্রথম মাসের অগ্রীম পেয়ে মন যেন খুশীতে অনচান করে উঠলো। টাকা নিয়ে লজিং বাড়িতে যাওয়ার সময় দুই কেজি মিষ্টি নিলাম। আমার ছাত্রছাত্রীদের খেতে দিলাম। সে সময় সাংবাদিকের নাম শুনলে মানুষ সম্মান করতো বেশী। আমার ক্ষেত্রেও তাই হলো। গৃহমালিক বললেন, আপনি যতদিন খুশী আমার বাসায় খাবেন, থাকবেন, আপনাকে পড়াতে হবে না। আপনার ব্যবহারে আমি খুব খুশী। যার বাড়িতে লজিং থাকতাম সেই ভদ্রলোক ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার আমার শিক্ষা জীবনে অনেক আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। আমার চাকুরির খবর শুনে ভদ্রলোকও খুশী হলেন। তার ব্যবহারে আমি মুগ্ধ হলাম। চোখে ফেটে জল এলো। কথায় বলে আপন চেয়ে পর ভালো, পরের চেয়ে পর…।

শুরু হলো সাংবাদিকতার জীবন। সিনিয়রদের স্নেহ ও অবহেলার মধ্যেই আমি নিয়মিত অফিস করতে লাগলাম। অল্পদিনের মধ্যেই আমি বার্তা সম্পাদক ও শিফট ইনচার্জের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হলাম। কঠোর পরিশ্রম, সপ্তাহে চারদিন ওভারটাইম করার সুযোগ দেয়া হলো। প্রথমে জানতাম না যে, ওভারটাইম করলে দ্বিগুন বেতন দেয়া হয়। মাস শেষে টের পেলাম, একদিন ওভারটাইম করলে দুই দিনের টাকা পাওয়া যায়। এতে আমি আরো উৎসাহিত হলাম।

দিনে দিনে আমি সকলের প্রিয়পাত্র হলাম। সাব এডিটর পদে চাকুরী করলেও আমি নিজ ইচ্ছায় রিপোর্টং করতাম, সময়ে সময়ে মফস্বল বিভাগে সাহায্য করতাম, নির্বাহী সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন অফিসে প্রচার করলেন, ‘মির্জা আমার কম্বাইন্ড হ্যান্ড’। এমনি এক পরিবেশে কঠোর পরিশ্রমের মধ্যেও আনন্দ প

চাকুরীর এক বছর পার হলো। এক বর্ষাকালে ঢাকায় দীর্ঘ ৭ দিন ধরে প্রচুর বৃষ্টিপাত। বৃষ্টিপাতের ৮ম দিনে আবহাওয়া এতো খারাপ ছিলো যে, বেলা ১ টা পর্যন্ত কেউ আসলেন না। সদরঘাট থেকে পুরো বাংলাবাজার এলাকায় একহাঁটু পানি জমে গেল। আমি বরাবরের মত সকাল ৯ টায় বৃষ্টির মধ্যেই অফিসে আসি। তবে কম্পোজ বিভাগের লোকজন সবাই এসেছিলেন। কম্পোজ বিভাগের প্রধান হারুন সাহেব বললেন, মীর্জা ভাই কেউতো আসেননি। আপনি টুকটাক নিউজ দিন, আমরা আস্তে আস্তে কম্পোজ শুরু করি। আমি বেশ কিছু কাটিং, মফস্বল সংবাদ সরবরাহ করলাম। রাত হলো কেউ এলেন না। কোন সাংবাদিকের পদস্পর্শ পড়লো না অফিসে। চারিদিকে অন্ধকার। বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কিন্তু পত্রিকা বের করবে কে? আমিতো জুনিয়র। বিপদে পড়লে সবাই আয়তুল কুরসী পড়ি। এক্ষেত্রেও তাই হলো। মনে সাহস এলো। যা হয় হোক। আমি আজ পত্রিকা একাই বের করবো। রাতেই সম্পাদকীয় লিখলাম। রেডিও থেকে সংবাদ শুনে ও টেলিপ্রিন্টারে সরবরাহকৃত নিউজ থেকে সাহায্য নিয়ে একটা লীড নিউজ করে দিলাম। ভোর ৪ টা পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে সকাল ৯ টার দিকে পত্রিকা বের হলো। সারারাত জাগার পর সকাল ১০ টার দিকে বাসায় গেলাম আর ভাবলাম, না জানি কাল কি হয়! যদি কেউ উল্টো দোষারোপ করেন, তুমি কে হে ছোকরা একাই পত্রিকা বের করো? পরের দিন আবহাওয়া ভালো হলো। ভয়ে ভয়ে বিকাল বেলা অফিসে আসলাম। অফিসে উঠতেই বার্তা সম্পাদক অধ্যাপক সিরাজুল হক, শিফট ইনচার্জ মোজাম্মেল হক আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আরে মির্জা, তুমিতো বাহাদুর। তুমি আমাদের ইজ্জত বাঁচিয়েছো। মোহাম্মদ হোসেন সাহেব আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সবাইকে বললেন, দেখুন যাকে আপনাকে টিটকারী মেরেছিলেন, সেই ছেলেটিই আজ আমাদের ইজ্জত বাঁচিয়েছে। আনন্দে আমি কেঁদে ফেললাম। মোহাম্মদ হোসেন সাহেব আমাকে আশির্বাদ করলেন, তুমি একদিন বড় সাংবাদিক হবে।

এ খবরটি মালিক সম্পাদক হাবিবুদ্দিন আহম্মেদের কানে চলে যায়। তিনিও আমার দক্ষতায় খুশী হোন। হাবিবুদ্দিন আহম্মদ সাহেব এক সময় ইস্পাহানী কোম্পানীর ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন। পরের দিন তার পিএ আমাকে তার মগবাজারস্থ বাসায় ডেকে নিয়ে গেলেন। হাবিবুদ্দিন সাহেবের স্নেহের কথা আমি কোনদিন ভুলবো না। তিনি বললেন, তুমি একাই পত্রিকা বের করেছো। ৫ হাজার টাকা হাতে দিয়ে বললেন, এই নাও তোমার পুরস্কার। তোমার যখন খুশী আমার কাছে আসবে। পরের দিন অফিসে প্রমোশনের চিঠি পেলাম। জুনিয়র সাব এডিটর থেকে সিনিয়র সাব এডিটর। তারপর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন কারনে জনপদের গতি থেকে যায়। এরপর প্রথিতযশা সাংবাদিক গিয়াস কালাম চৌধুরীর একটি চিঠি নিয়ে উধরষু গড়ৎহরহম চড়ংঃ এ চাকরি নিই। এগিয়ে চলে আমার সাংবাদিকতার জীবন। কিন্তু আজও আমার প্রথম সাংবাদিকতা, প্রথম মাসের বেতন, প্রথম অফিসিয়াল অভিভাবকদের কথা মনে হয়। মনে হয়, যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ…। ‘৭৮ থেকে ২০১৩ সাল। দীর্ঘ ৩৫ বছর। আঞ্চলিক থেকে জাতীয় দৈনিকে ভাল ভাল পদে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এখনও করছি। কিন্তু দৈনিক জনপদের সেই মালিক হাবিবুদ্দিন আহম্মদ, সাংবাদিক মোহাম্মদ হোসেন, মোজাম্মেল হক বেঁচে নেই…। স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে অনেক কিছু…।

 

লেখক পরিচিতিঃ মির্জা সেলিম রেজা

নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক মহাস্তান